প্রবন্ধমনন-অনুধাবন

পশ্চিমি চিকিৎসা যেভাবে ‘ভারতীয়’ হল

ভারতবর্ষে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সেনাবাহিনীর তৎপরতা বৃদ্ধি পেয়েছিল ইংরেজ ও ফরাসিদের মধ্যে সংঘটিত কর্ণাটকের যুদ্ধের সময় থেকে। কোম্পানির রাজ্যসীমা দ্রুত বৃদ্ধি পেতে থাকলে সৈন্যসংখ্যা বৃদ্ধি পায়। কোম্পানির সঙ্গে ভারতে আগত চিকিৎসকের সংখ্যা ছিল খুব কম। ফলে সরকার ও সরকারের হিতাকাঙ্ক্ষী ব্যক্তিরা এদেশের আধুনিক শিক্ষিত যুবকদের পশ্চিমি চিকিৎসাবিজ্ঞানে শিক্ষিত করে তোলার চিন্তাভাবনা শুরু করেন।

১৮২২ সালে কোম্পানি অধিকৃত বাংলায় এদেশীয় যুবকদের জন্য আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞান শিক্ষার প্রচলন সরকারিভাবে শুরু হবার অনেক আগে থেকেই বহু ভারতীয় যুবক বিভিন্ন হাসপাতালে সার্জেনদের কাছে অ্যালোপ্যাথি শাস্ত্রে ট্রেনিং নিয়ে বিভিন্ন হাসপাতালে, সেনাবাহিনীতে কিংবা স্বাধীনভাবে চিকিৎসা শুরু করে দিয়েছিলেন।

১৮২২ সালের ৯ মে কোম্পানির মেডিকেল বোর্ড এদেশীয় যুবকদের পাশ্চাত্য চিকিৎসাবিজ্ঞানে শিক্ষিত করে তোলার উদ্দেশ্যে একটি মেডিক্যাল স্কুল খোলার আবেদন জানিয়ে সরকারের কাছে একটি স্মারকলিপি পেশ করে। সরকার এই আবেদনে সাড়া দিলে ১৮৩৩ সালের ২১ জুন কলকাতায় প্রতিষ্ঠা হল ‘স্কুল ফর নেটিভ ডক্টরস’।

আরো পড়ুন : পশ্চিমি চিকিৎসা যেভাবে ‘ভারতীয়’ হল

১৮২২ খ্রিস্টাব্দে প্রকাশিত ‘সমাচার দর্পণ’-এ লেখা হল : “শ্রী শ্রীযুক্ত কোম্পানি বাহাদুরের পল্টনের মধ্যে সর্বদা এক একজন বাঙালি চিকিৎসক জ্ঞানবান থাকিবার আবশ্যকতা আছে কিন্তু তেমনি চিকিৎসকের অভাব প্রযুক্ত শ্রী শ্রীযুক্ত বড়ো সাহেব আজ্ঞা করিয়াছেন যে শহর কলকাতায় এক পাঠশালা স্থাপিত হয় এবং ঐ পাঠশালাতে একজন বিজ্ঞ ইংলন্ডীয় চিকিৎসকের অধীন বিশজন হিন্দু কিংবা মুসলমান বিদ্যার্থী থাকিবে। যাহারা ঐ পাঠশালায় নিযুক্ত হইবে তাহারা পার্শিয়ান কিংবা নাগরী ও হিন্দু স্থানীয় ভাষা ভালোমতো জানিবে এবং ২৬ বছর বয়সের অধিক ও ১৮ বছর বয়সের কম নিযুক্ত হইতে পারিবে না। ইহারা ওই সাহেবের অধীনে থাকিয়া চিকিৎসাশাস্ত্র শিক্ষা করিবে। ইহারা যখন পাঠশালায় নিযুক্ত হইবে, সেই অবধি করিয়া ১৫ বৎসর পর্যন্ত তারা শ্রী শ্রীযুক্ত কোম্পানি বাহাদুরের কর্মে নিযুক্ত হইবে কিন্তু একালের মধ্যে ওই কর্ম ত্যাগ করিতে পারিবে না।১৫ বৎসর পর যদি যুদ্ধাদি উপস্থিত না থাকে, তবে বাসনা মতো কর্মত্যাগ করিলে করিতে পারিবে। বিদ্যার্থীরা এক্ষণে ৮ টাকা করিয়া মাসে মাসে খোরাকি পাইবে কিন্তু কর্মপোযুক্ত হইলে কোনো জিলাতে কিংবা পল্টনেতে কর্ম পাইবে তখন ইহাদের মাহিনা স্থির থাকিবার সময় ২০ টাকা ও পল্টন কুচের সময় ২৫ টাকা হইবে। যদি তাহাদের ব্যবহার ভালো হয় তবে সাত বছর অন্তর ৫ টাকা মাহিনা অধিক পাইবে”।

আরো পড়ুন : করোনা আতঙ্কের ব্যবসা, পর্ব-১

উনিশ শতকের বাংলায় তথাকথিত নবজাগরণের ফলে বহু দেশীয় প্রজা পাশ্চাত্য চিকিৎসা বিজ্ঞানের প্রবল সমর্থকে পরিণত হয় । অন্যদিকে ভারতের মধ্যে ও ভারতের বাইরে প্রাচ্যপন্থীরা এবং দেশীয় রাজনৈতিক শক্তি দুর্বল হয়ে পড়ার সাথে সাথে কোম্পানির সঙ্গে প্রতিযোগিতা করার মতো কোনো প্রতিদ্বন্দ্বীই অবশিষ্ট রইল না। ফলে সরকারের পক্ষে যে কোনো বিষয়ে স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নিতে কোনো অসুবিধা হলো না।

ভালোবাসার পক্ষে থাকুন, নিবিড়-এর সঙ্গে থাকুন

Image by Steve Buissinne from Pixabay

About author

Articles

বিশিষ্ট লেখক, চলচ্চিত্রকার ও মানবাধিকার কর্মী
উত্তান বন্দ্যোপাধ্যায়
Related posts
গৃহস্থালিদৈনন্দিন

এত গরমে সুস্থ থাকবেন কীভাবে?

গ্রীষ্মকাল শুরু হয়ে গিয়েছে পুরোদমে এবং এই বছর ভারতের বেশিরভাগ অঞ্চল স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি উষ্ণ হবে বলেই আশা করা হচ্ছে। প্রচণ্ড গরম ও অস্থিরতার পাশাপাশি এই ঋতুতে নানা রোগ-বালাই লেগেই থাকে। কিছু ব্যাকটেরিয়া এবং ভাইরাস…
Read more
প্রবন্ধমনন-অনুধাবনস্বাস্থ্য

স্বাস্থ্যের অসুখ – বিজ্ঞান বনাম নৈতিকতা

ঔপনিবেশিক বাংলার চিকিৎসা ব্যবস্থা নিয়ে ইতিপূর্বে বহু গবেষণা হলেও, সেগুলিতে রোগী ও চিকিৎসকের মানসিক সম্পর্কগুলির টানাপোড়েনের উপর আলোকপাত করা হয়নি। কিন্তু চিকিৎসা ব্যবস্থার সামাজিক ইতিহাস রচনায় এই দিকটি বিশেষ গুরুত্বের দাবি রাখে। তাই সমাজের দর্পণ…
Read more

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

খবরখেলাবিদেশ

ফের ডিটেনশনে রাখা হল নোভাক জকোভিচকে, মানুষের জন্য ‘ক্ষতিকর’ তকমা!

Worth reading...