প্রবন্ধমনন-অনুধাবন

বাংলার ভোটে হারল নির্বাচন কমিশন

বাংলার ভোট-মহাযুদ্ধ বোধহয় শেষ হল। রাজ্যের শাসকদল ২০০-র বেশি আসন নিয়ে ও বিপুল জনসমর্থন নিয়ে ফিরছে ক্ষমতায়। কোথাও কোনো সংশয় নেই ঐ দলের জয়ে। কিন্তু হারল কে? বিজেপি? যে দল দাবি করেছিল অন্তত ২০০ আসন তারা পাবেই, তাদের হয়ে প্রচারে এলেন প্রধানমন্ত্রী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইত্যাদি। এলেন এমন সময়, যখন দেশ করোনা নামের মহামারির দ্বিতীয় ঢেউতে কার্যত বিপর্যস্ত। তাতে কী, তাদের কর্তারা বলে দিয়েছেন শ্যামাপ্রসাদের রাজ্যে পদ্মরাজ কায়েম করতেই হবে যে কোনও মূল্যে (এর জন্য তারা বিদ্যাসাগর থেকে অমর্ত্য সেন – সবাইকে অপমান ও অপদস্থ করার দায়ও বুঝি নিজ কাঁধে তুলে নিয়েছে)। যদি দেশ, তার মানুষ, তার সংস্কৃতি, অর্থনীতি, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি, বিচারব্যবস্থা উচ্ছন্নে যায় তো যাক। ঘোড়া কিনতে হলে সেও ভালো। রাজ্যটা দখলে আনা চাই।

তারা পারেনি, এই রাজ্যের মানুষ তাদের বুঝিয়ে দিয়েছে এ মাটি কেমন মাটি। তবে অসম্মানও করেনি, তাদের দিয়েছে প্রধান বিরোধী দলের সম্মান। সে বড়ো কম নয়। কিন্তু তারা পারবে সে কাজ করতে? পারবে তারা অসহায় মানুষের কথা শাসকের/ প্রশাসকদের কানে তুলতে। নায়ক হলেও তারা কি ভুলতে পারবে যে, তারা পরাজিত। লোকসভায় অমন তাক লাগানো জয় পাবার পর কি ভুলতে পারে যে, তারা হেরেছে। তেমন আত্মবিশ্বাস বা আত্মসম্মান কি তাদের আছে?

কিন্তু শুধু কি তারাই হেরেছে? হেরেছে সংযুক্ত মোর্চাও। এই প্রথম রাজ্য বিধানসভায় কংগ্রেস বা কমিউনিস্ট দলের কোনও প্রতিনিধির দেখা মিলবে না। তারাও হেরেছে। (এটা নিছক ভুল নয়, এ এক মস্ত অপরাধ। এই অপরাধের মূল্য চোকাতে হবে অদূর ভবিষ্যতে, আগামী প্রজন্মের কাছে জবাবদিহি করতে হবে আমাদের। আজকের নেতারা কেটে পড়তে পারেন, দায় এড়ানোর নানা যুক্তি-তর্ক শোনাতে পারেন, কিন্তু তা গ্রহণযোগ্য হবে কি? আর কেউ হারেনি?

আর অবশ্যই হেরেছে নির্বাচন কমিশন। কেবল আট দফায় নির্বাচন নয়, মাসাধিক কাল জুড়ে চলেছে নির্বাচনী তাণ্ডব। এর দায় কার? তারা বিজেপির নির্দেশে চলেছে কিনা জানি না, কিন্তু জানি, করোনা মহামারির তীব্রতা দেখেও, বুঝেও তারা তাণ্ডব চালিয়েছেন। আদালতের নির্দেশও উপেক্ষা করেছেন। তারা যত্রতত্র অফিসার বদল করেছেন, রাজ্যের সরকার ও প্রশাসনকে ঠুঁটো করেছেন আইন তথা সংবিধানের নামে। নিজেরা নিজ নিজ কর্তব্য অবশ্য ভুলেছে; ভুলেছে মৌলিক কথা যে মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকার নিশ্চিত করতেই নির্বাচন। মানুষ মারতে নয়।

কাউকে নির্বাচনবিধি লঙ্ঘনের দায়ে শাস্তি দিতে ভুলে গেছেন, কাউকে মাত্রাছাড়া শাস্তি দিয়েছেন। শুনতে পাননি ‘বেগম’ শব্দ বা প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ ভঙ্গির ‘দিদি’ ডাক।

এতো করেও ঠেকাতে পারেননি শীতলকুচি। অথচ অনেক দফা নির্বাচনের কারণ তো ছিল নাকি রক্তপাতহীন নির্বাচন! মানুষ তো তাদের কাজে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করেনি, তবু শীতলকুচি! তারা ঠেকাতে পারেন নি, বা চাননি তারা অধিকারী পরিবারের মুকুটহীন বাদশা বা শাহেনশা শুভেন্দুর পরাজয়। ইচ্ছে করলে তারা যে হয় কে নয় করতে পারেন তা দেখাতেই বুঝি তারা বেছে নিলেন নন্দীগ্রাম মঞ্চ।

মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তো ঠিকই বলেছেন, তিনটি মানুষ (বা পদলোভী তিন অমানুষ) দেশ চালাবে কেন? তাও এতো দীর্ঘকাল! ওদের নির্বাচন নিয়ে প্রশ্ন তুলে দিলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়।

অবশ্যই এই পরাজয়ের জন্য নির্বাচন কমিশনের অমানুষদের জনগণের কাছে জবাব দেবার দায় নেই, দায় নেই তন্ময় ভট্টাচার্যের মতো কোনও বেয়াড়া জননেতার মুখোমুখি হবার। কিন্তু, ওদেরও তো দায় আছে নিজ সন্তান-সন্ততির প্রতি। তাদের কাছে এই পোড়ামুখ দেখাতে পারবেন তো কর্তাবাবুরা?

আমাদেরও দায় আছে, কেবল এক বিভেদকামী শক্তির পরাজয়ে ঘুমোতে যাওয়া চলবে না। তাদের ও তাদের পদলেহী কমিশনকেও দেশ থেকে ঝেটিয়ে বিদায় করার কাজটাও করতে হবে আমাদের। আর গড়ে তুলতে হবে প্রকৃত বিরোধীপক্ষ।

অশোকেন্দু সেনগুপ্ত