প্রবন্ধমনন-অনুধাবন

সাধারণ মানুষের সমস্যা থেকে নজর ঘুরিয়ে চলেছে রাষ্ট্র এবং মিডিয়া

এতদিনে অনেকে আলাপন প্রসঙ্গ ছেড়ে মেতেছেন ভিন্ন প্রসঙ্গে। এমনই হয়। ওরা নাচায়, আমরা নাচি। ওরা কে তা নিশ্চয় বুঝিয়ে বলতে হবে না। অতি উৎসাহে কেউ. কেউ আলাপন বন্দ্যোপাধ্যায়ের মুখ্যসচিব পদ ত্যাগ করার সাথে নেতাজির আইসিএস হবার সুযোগ ছেড়ে আসার ঘটনা তুলনীয় মনে করেছেন। নিশ্চয় তাদের সে অধিকার আছে। তবে কথা বলা বা স্বাধীন মতপ্রকাশের স্বাধীনতার অপব্যবহারে শেষ অবধি বর্তমান শাসকের মতো শক্তির জয়ই নিশ্চিত হয় কিনা ভেবে দেখতে বলি। তারই ফাঁকে বলি আলাপনের কথা।

কে এই আলাপন? কারা তার এমন পতনে শোকার্ত? সে আলোচনার আগে নিশ্চয় এই ঘটনায় কেন্দ্রের বর্তমান ঘৃণ্য শাসকশক্তির সম্পর্কে দু’চার কথা বলা প্রয়োজন। একে তো তারা যেন শেষ যুদ্ধে (বাংলার বিধানসভা নির্বাচন) হেরে গেছে বলে খুজে চলেছে অন্য অন্য সীমান্ত ক্ষেত্র । এমন নয় যে ক্ষেত্র নেই, এ পোড়া দেশে সমস্যার তো শেষ নেই – আর্থিক সমস্যা, শিক্ষার সমস্যা, স্বাস্থ্য পরিষেবার সমস্যা এসব তো আছেই এবং তা বেড়েই চলেছে তাদের অপদার্থতায়। তার ওপর এসেছে কোভিড (এখন আবার এসেছে তার ২য়/ ৩য় তরঙ্গ)। মড়ার ওপর খাড়ার ঘায়ের মতো কিছু রাজ্যে হাজির হয়েছে ‘ইয়স’ তুফান। এসব সমস্যার দিকে তাকিয়ে নিযেদের ভুলত্রুটি শুধরে কেন্দ্রীয় সরকার পথচলার সুযোগ নিতে পারত, তা না করে তারা অন্য ক্ষেত্র খুঁজেছে। খুঁজতে খুঁজতে এসে যেন হাজির হয়েছে কেব্দ্র-রাজ্য সম্পর্কের ক্ষেত্রে। এ যেন সেই ছাগল আর বাঘের পুরোনো গল্প – তুই জলঘোলা করিস নি তো তোর দাদু এই জল ঘোলা করেছে।

ওদিকে (করোনা তো একদিন না একদিন বিদায় নেবে, নিতেই হবে) করোনা পরবর্তীকালে কোন পথে এগোবে পৃথিবী তা আমরা জানি না। জানার পথগুলো ভুলিয়ে দিতেই যেন কেন্দ্র-রাজ্য সম্পর্ক, আইএএসদের আচরণববিধি, দেশের বর্তমান বিচারব্যবস্থা, নারদা-সারদা কেলেংকারি, দক্ষতা বনাম দুর্নীতি, সারদা-নারদা ইত্যাদি প্রসঙ্গ সামনে আনা হচ্ছে। কারা আনছে? – রাষ্ট্র আর মিডিয়া। তারা দুটো পক্ষই ভাবছে যেন সাধারণ মানুষের, খেটে খাওয়া মানুষের দৃষ্টি ঘোরানোটা বেশি জরুরি। ভাবখানা এই যে, ভবিষ্যতে কী হবে কীভাবে, সে সব আমরা নয় তখন ভাবব, ওদের কখনই ভাবতে দেব না। ওরা আলাপন ইত্যাদি নিয়ে ভাবুক।

আরও পড়ুন : বাংলার ভোটে হারল নির্বাচন কমিশন

কিন্তু আমরা যদি বর্তমান নিয়ে কিছু বেয়াড়া প্রশ্ন তুলি? যদি জানতে চাই – কেন আমরা নিয়মিত খেতে পাই না, কেন নিখরচায় প্রতিষেধক পাই না, কেন আমাদের বাচ্চারা স্কুল-কলেজে যেতে পারে না বা কবে পারবে?

না, এসব অস্বস্তিকর প্রশ্ন তুলে ওরা সরকারকে বিব্রত করবে তা হবে না। তা বলে যে তাদের গারদে পুরে রাখবে তেমন সাধ্য নেই।

এর মধ্যে তিনি মুখ্যসচিবের পদ ছেড়ে মুখ্যমন্ত্রীর প্রধান উপদেষ্টা হয়েছেন। ক্ষতি হল তাঁর! ভদ্রলোক কদাচ দূরে যাননি, কলকাতার কাছাকাছিই থেকেছেন চিরদিন। ওপরওয়ালাকে তেল দিয়ে দিয়ে নিজের ভবিষ্যৎ গড়েছেন। কর্তার রাজনৈতিক রং দেখেননি। বউকে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য করার পেছনে তিনি যে কোনও ভাবে কলকাঠি নাড়েননি তা কি বলা যায়? ওঁর সপক্ষে যে সব প্রাক্তন আমলা মুখ খুলেছেন তারা সকলেই কেন্দ্রের বিরুদ্ধে তোপ দেগেছেন যথাযথ কারণেই। কেউ কিন্তু বলেননি আলাপনের দক্ষতা নিয়ে কিছু।

এই সেই ভদ্রলোক যার জন্য পঞ্চায়েত নির্বাচনের কালি আজও মোছেনি। সে কালি কোনও রাজনৈতিক দলের ক্ষতি করেনি হয়তো, কিন্তু দারুণ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে গণতন্ত্র।

অশোকেন্দু সেনগুপ্ত

About author

Articles

অধ্যাপক, সমাজকর্মী ও শিক্ষাবিদ
অশোকেন্দু সেনগুপ্ত

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *