প্রবন্ধমনন-অনুধাবন

লাহোর, হিজলি, আজকের তালোজা: বন্দি মুক্তিসৈনিকের মৃত্যু এবং চরিত্রেরা

“একদিন সংবাদ আসিল লাহোর জেলে যতীন দাস নামে একজন বিপ্লবী যুবক অনশনে প্রাণত্যাগ করিয়াছে; জেল-কর্তৃপক্ষের অন্যায়ের প্রতিবাদে এই আত্মাহুতি। শান্তিদেব লিখিয়াছেন – এই সংবাদ যেদিন আসিল, সেদিন তপতীর মহড়া জমিল না, কবিকে খুবই অন্যমনস্ক দেখা গেল। মনের এই অবস্থায় কবি লেখেন ‘সর্বখর্বতারে দহে তব ক্রোধদাহ’ গানটি। গানটি ‘তপতী’র অন্তর্ভুক্ত করা হয়।”

লাহোর জেলে যতীন দাসের মৃত্যু হল ১৩ সেপ্টেম্বর, ১৯২৯। ‘তপতী’র টানা চারটি অভিনয় হয়েছে সেপ্টেম্বরের ২৬, ২৭, ২৯ এবং অক্টোবরের ১ তারিখে। এরই কিছু আগে যতীন দাসের মৃত্যুর খবর আসে। অস্থিরতার গর্ভ থেকে উঠে আসে কিছু লাইন – “দুঃখের মন্থনবেগে উঠিবে অমৃত, / শঙ্কা হতে রক্ষা পাবে যারা মৃত্যুভীত।” যতীন দাসের মৃত্যুতে শোকাতুর কবি কিন্তু দুঃখের জয়গান গাননি, বরং, এইসব তরুণ প্রাণদের মৃত্যু-তুচ্ছতাকে নির্দ্বিধায় কুর্নিশ করেন।

আজীবন সশস্ত্র বিপ্লব বা যুদ্ধে আপত্তি জানিয়েও তাঁর এই বারবার বিপ্লবীদের সহায় হওয়ার বিরল মানবমূল্যবোধ দেখা গেছে, বিশেষত, জালিয়ানওয়ালাবাগ-পরবর্তী সময়ে থেকে থেকে যেভাবে গর্জে উঠেছেন, তা তাঁর নিজের মধ্যেও একপ্রকার আত্মিক উত্তরণের দোলাচলের পরিচয় দেয়। খবরটা আসার দিন ‘তপতী’র অভিনয় জমেনি।

যতীন দাস

ঠিক দু’বছর পার করে আমরা আসি। আবার সেই মধ্য সেপ্টেম্বর। আবারও জেলে স্বাধীনতা সংগ্রামীর মৃত্যু। যতীন দাসকে রাষ্ট্র তিলে তিলে শেষ করেছিল। এবার সমস্ত বর্বরতা ছাপিয়ে গেল হিজলির বন্দিনিবাসে। সন্তোষ কুমার মিত্র ও তারকেশ্বর সেনগুপ্ত শহিদ। অমানুষিক অত্যাচারিত হলেন আরও প্রায় জনা ত্রিশ বিপ্লবী।

১৬ সেপ্টেম্বর, ১৯৩১ সালে কবির বয়স ৭০ বছর ৪ মাস ৯ দিন। কবি কিন্তু সেদিন বয়স, শরীরের অসুস্থতাকে তোয়াক্কা না করেই মনুমেন্টের তলায় বিপুল জনতার সামনে তাঁর ভাষ্য রেখেছিলেন। যে ভাষ্যে স্বভাব-সংযম থাকলেও, হিংসার পথ থেকে বিরত থাকার কথা থাকলেও, স্পষ্ট হুঁশিয়ারি কিন্তু ছিল –

“এ সভায় আমার আগমনের কারণ আর কিছু নয়, আমি আমার স্বদেশবাসীর হয়ে রাজপুরুষদের এই বলে সতর্ক করতে চাই যে, বিদেশি-রাজা যত পরাক্রমশালী হোক না-কেন, আত্মসম্মান হারানো তার পক্ষে সকলের চেয়ে দুর্বলতার কারণ। …প্রজাকে পীড়ন স্বীকার ক’রে নিতে বাধ্য করা রাজার পক্ষে কঠিন না হতে পারে, কিন্তু বিধিদত্ত অধিকার নিয়ে প্রজার মন যখন স্বয়ং রাজাকে বিচার করে তখন তাকে নিরস্ত করতে পারে কোন শক্তি?”

হিজলির বন্দিনিবাস ছিল জঙ্গলের মাঝখানে। চারপাশের ঘেরাটোপ এত দুর্ভেদ্য ছিল যে, তা টপকে খবর কেন, মাছি গলাও অসম্ভব ছিল। তবুও সেই প্রহরা ভেদ করে পালিয়েছিলেন তিন বিপ্লবী। আসলে বাঘের বাচ্চা তো, জঙ্গলটা তাঁরাই ভালো চিনবেন। তার ‘শাস্তি’ দিতেই এই কাণ্ড ঘটিয়েছিল ব্রিটিশ সরকার। দুই ঘটনার মধ্যেই আরও একটি মিল ছিল। দুই ক্ষেত্রেই বিপ্লবীদের মরদেহের ভার নিয়েছিলেন সুভাষ বোস। “আমি খড়গপুর হইতে অবর্ণনীয় বেদনা লইয়া ফিরিয়া আসিয়াছি।” হিজলির খবর আসে কিছুদিন পরে, দু’জন বিপ্লবীর মায়ের মারফত। তাঁরা জেলে ছেলেদের খবর নিতে গিয়েছিলেন।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

ব্রিটিশ সরকার কীরকম চাপে পড়েছিল, তা দৈনিক স্টেটসম্যানের সাফাই গাওয়ার ঘটনাতেই স্পষ্ট হয়। তাদের মতে, কারারক্ষীদের এত স্নায়ুর চাপ থাকে যে, ঠিক-বেঠিকের বোধ মাঝেমধ্যেই লুপ্ত হয়, ফলে যিশুখ্রিস্টের আদর্শে তাদের ক্ষমা করে দেওয়াই উচিত। রবীন্দ্রনাথ এই ধ্যাষ্টামোর উত্তরে যে ভাষায় আক্রমণ করেন, তা বিশেষ লক্ষণীয় –

“এইসব অত্যন্ত চড়া নাড়ীওয়ালা ব্যক্তিরা স্বাধীনতা ও অক্ষুণ্ণ আত্মসম্মান ভোগ করে থাকে। এদের বাসা আরামের, আহার-বিহার স্বাস্থ্যকর; এরাই একদা রাত্রির অন্ধকারে নরঘাতক অভিযানে সকলে মিলে চড়াও হয়ে আক্রমণ করলে এইসব হতভাগ্যদেরকে যারা বর্বরতম প্রণালীর বন্ধনদশায় অনির্দিষ্টকালব্যাপী, অনিশ্চিত ভাগ্যের প্রতীক্ষায় নিজেদের স্নায়ুকে প্রতিনিয়ত পীড়িত করছে। সম্পাদক তাঁর সকরুণ প্যারাগ্রাফে স্নিগ্ধ প্রলেপ প্রয়োগ ক’রে সেই হত্যাকারীদের পীড়িত চিত্তে সান্ত্বনা সঞ্চার করেছেন।

…এ কথাও ইতিহাসবিখ্যাত যে যাদের হাতে সৈন্যদল ও রাজপ্রতাপ অথবা যারা এই শক্তির প্রশ্রয়ে পালিত, তারা বিচার এড়িয়ে এবং বলপূর্বক সাধারণের কণ্ঠরোধ ক’রে ব্যাপকভাবে এবং গোপন প্রণালীতে দুর্বৃত্ততার চূড়ান্ত সীমায় যেতে কুণ্ঠিত হয়নি।” (‘প্রবাসী’ পত্রিকায় ‘হিজলী হত্যাকাণ্ড সম্বন্ধে রবীন্দ্রনাথ’ শিরোনামে প্রকাশিত হয়েছিল)

আরও পড়ুন : সাধারণ মানুষের সমস্যা থেকে নজর ঘুরিয়ে চলেছে রাষ্ট্র এবং মিডিয়া

এবার তাঁর একটি কবিতার দিকে তাকানো যাক। বিখ্যাত কবিতা। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করেই লেখা, একথা সর্বজনবিদিত। কিন্তু, আমরা সেই কবিতার ক’টা লাইনকে খানিক যদি অন্যভাবে দেখি? খুব চেনা কয়েকটা লাইন – “আমি-যে দেখেছি গোপন হিংসা কপট রাত্রিছায়ে / হেনেছে নিঃসহায়ে, / আমি-যে দেখেছি প্রতিকারহীন শক্তের অপরাধে / বিচারের বাণী নীরবে নিভৃতে কাঁদে”। স্টেটসম্যানের সম্পাদকের ধ্যাষ্টামোর উত্তরে রবীন্দ্রনাথ যা বলেছিলেন, উপরিউল্লিখিত ওই গদ্য-বয়ান অংশেরই যেন কাব্যিক অনুরণন ধ্বনিত হল এই কয়েকটি লাইনে।

‘প্রশ্ন’ লেখা হয়েছিল পৌষ, ১৩৩৮ বঙ্গাব্দে, অর্থাৎ, কয়েক মাস পরে। কবিতায় ক্ষমা-র প্রসঙ্গ এসেছে দু’বার। বলা হয়ে থাকে, গান্ধিজি যেহেতু চেয়েছিলেন দেশবাসী এই অপরাধীদের ক্ষমা করে দিক, রবীন্দ্রনাথের কবিতা ছিল সেই ঘটনাকে নির্দেশ করে। ‘ভগবানের দূত’ বলতে গান্ধিকেই নির্দেশ করেছেন তিনি। কিন্তু গান্ধি আদৌ এরকম কিছু বলেছিলেন কিনা, তা নিয়ে সন্দেহের যথেষ্ট অবকাশ রয়েছে। বরং, হিজলির ঘটনা নিয়ে গান্ধির বয়ান অন্যরকম কিছুরই ইঙ্গিত করে। সরাসরিভাবে ক্ষমার কথা কিন্তু সেখানেই নেই। প্রসঙ্গান্তর মনে হতে পারে, কিন্তু আদপেই তা নয়।

মহাত্মা গান্ধি

প্রথমত, গান্ধি তখন ভারতবর্ষে নেই। আগস্ট মাসেই জাহাজে রওনা দিয়েছেন লন্ডনের উদ্দেশ্যে, দ্বিতীয় গোলটেবিল বৈঠকে জাতীয় কংগ্রেসের একমাত্র প্রতিনিধি হিসেবে যোগ দিতে। লন্ডনে বসে গান্ধি এই ঘটনা সম্পর্কে যখন বলছেন, তখন প্রায় দেড় মাস পেরিয়ে গেছে। প্রামাণ্য তথ্য ঘাঁটলে আমরা যা পাচ্ছি, তাতে দেখছি, ৩০ অক্টোবর প্রেসকে তিনি যে বয়ান দিচ্ছেন, সেখানে প্রথম আসছে হিজলির উল্লেখ (অন্তত ভারত সরকারের প্রকাশিত ৯৮ খণ্ডের ‘The Collected Works of Mahatma Gandhi’-র ৫৪ নম্বর ভল্যুম অনুযায়ী ধরলে)।

‘দ্য বম্বে ক্রনিক্যাল’-এ ৩১ অক্টোবর প্রকাশিত হয় এই বয়ান। বক্তব্যটি গান্ধি শুরু করেছিলেন কলকাতার ইউরোপিয়ান অ্যাসোসিয়েশনের প্রেসিডেন্ট ই. ভিলিয়ার্স ও ঢাকার জেলাশাসক এল. জি. ডুর্নোর ওপর সংঘটিত আক্রমণের সমালোচনা করে। এটা আমরা সকলেই জানি, অহিংসা-ব্যতীত অন্য কোনো পথ নিলেই তিনি আপত্তি জানাতেন। সেখানে হিজলির প্রসঙ্গের সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের ভূমিকার কথা উল্লেখ করছেন। এবার ওইদিনই ওয়েস্টমিনস্টারের সেন্ট্রাল হলে সোশ্যালিস্ট লেখক-কার্টুনিস্ট জেমস ফ্রান্সিস হোরাবিনের সভাপতিত্বে কমনওয়েলথ অফ ইন্ডিয়া লিগের সভায় গান্ধি যে দীর্ঘ বক্তৃতা দেন, সেখানে চট্টগ্রাম এবং হিজলি নিয়ে তিনি কী বলেছিলেন, সেই বিস্তৃত অংশটি এখানে তুলে দিচ্ছি। তাতে ধারণা সুস্পষ্ট হবে।

“…It was therefore the duty of institutions like the Commonwealth League to acquire true knowledge about India with reference to the past as well as the present.

There is also I see a conspiracy of silence with reference to the events happening in India. Barbarities, or, I may say, atrocities have been committed in Chittagong. …An officer was assassinated by a Bengali youth of about 16 years. By way of reprisal, shops were looted and atrocities were committed which aroused even men like the Poet Tagore to indignation.

…After Chittagong, we have the incident at Hijli, where are kept what are called detenus. Now, you may not know what is meant by a detenu. I shall tell you immediately. A detenu is a person kept in prison without a trial. He does not even know what the charges against him are. Simply on suspicion of being a terrorist or belonging to terrorist organization, he is detained, and detained indefinitely. In no sense he is an ordinary prisoner.

These Hijli detenus are supposed not to have behaved quite according to the proper standard – the standard of the guards on duty. I am giving you simply the newspaper reports or a bare summary of the evidence of the report of a recent inquiry. For their misbehavior, these men were shot, two died and several others were injured.

About the Hijli atrocities the poet is indignant. I have mentioned to you only the poet’s name because he is a well-known figure. Besides him, many people of name and fame have attended meetings convened to condemn these wanton atrocities.

But here in this country, you do not know what things are happening in India and how they stir the people.

You are simply told by the British Press that the detenus are bad fellows. They are people who deserve what Government, in the name of law and order, are giving them.”

ওই একই বক্তৃতায় তিনি ইংল্যান্ডবাসীর উদ্দেশ্যে বলেন – “Today India is one vast prison-house. We are prisoners. You Englishmen and Englishwomen are our jailors.” তাঁর বক্তব্যে একথা অন্তত পরিষ্কার যে, তিনি কোথাও ক্ষমার কথা বলেননি। বরং, ইংরেজ সরকার এবং ইংরেজ গণমাধ্যমের ভূমিকাকে মুহুর্মুহু আক্রমণ শানিয়েছেন। বক্তৃতা জুড়ে দেশবাসীকে শান্ত থাকার উল্লেখও করেছিলেন স্বভাবসিদ্ধ ভঙ্গিতে। সশস্ত্র বিপ্লবীদের কাজকে তিনি সমর্থন করেন না, তা তাঁর সত্যের পরীক্ষার পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়। তিনি ভিলিয়ার্স এবং ডুর্নোর উপর আক্রমণের নিন্দা করেন। কিন্তু এই কমনওয়েলথ লিগের বক্তৃতাতেই ওই দুই ঘটনার উল্লেখ করে তিনি যে উক্তিটি করছেন, তাও বিশেষভাবে লক্ষ করার মতো –

“They are deplorable and from my standpoint, disgraceful and embarrassing to what I represent. However, I cannot understand why so much is made of these incidents. I should ask and tell you frankly to you, the British public, other incidents such as Chittagong and Hijli should also be made much of.”

‘ব্যালেন্স হারানো’ তরুণ প্রাণদের সশস্ত্র কার্যকলাপের পরেও আসলে কোন ঘটনা বেশি নিন্দনীয়, সেকথা বলতে গিয়ে তিনি সরকারের দিকেই আঙুল তোলেন। কোথাও যেন ‘বিগড়ে যাওয়া ছেলেদের’ প্রতি তাঁর স্নেহ জিতে যায় সমস্ত মতাদর্শগত বিভেদের উর্ধ্বে গিয়ে। তিনি তাদের আড়াল করেন।

সুভাষচন্দ্র বসু

হিজলির ঘটনার উল্লেখ আবার পাচ্ছি ১০ নভেম্বর যতীন্দ্রমোহন সেনগুপ্তকে দেওয়া একটি সাক্ষাৎকারে। যতীন্দ্রমোহনের কাছ থেকে তিনি বাংলার পরিস্থিতি সম্পর্কে খবর জানার পর বলেন, হিজলির ঘটনা নিয়ে তিনি খুব একটা ভালো কিছু আশা করছেন না। রবীন্দ্রনাথের ভাবনারই পুনরাবৃত্তি। প্রসঙ্গত, হিজলিতে দুই বিপ্লবীর মরদেহ আনতে সুভাষচন্দ্রের সঙ্গে যতীন্দ্রমোহনও গিয়েছিলেন, সঙ্গে ছিলেন নৃপেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়।

১০ নভেম্বরেই লন্ডন স্কুল অফ ইকনমিক্সে তিনি যে বক্তৃতা দেন, সেখানেও ইংরেজ সংবাদপত্র এবং ইংরেজ সরকারের ভারতীয়দের প্রতি মনোভাবকে একই ভাষায় আক্রমণ করেন। এই সময়ে তাঁর লেখায় হিজলির শেষ উল্লেখ পাওয়া যাচ্ছে তৎকালীন ভারতসচিব স্যার স্যামুয়েল হোয়ারেকে লেখা একটি চিঠিতে। সেখানে বল্লভভাই প্যাটেলের একটি চিঠির অংশ উদ্ধৃত করে তিনি সরকারের দমননীতির কথা সুস্পষ্ট করেন। যখনই হিজলির কথা বলেছেন, সঙ্গে চট্টগ্রামের কথাও বলেছেন। পুলিশ কীভাবে নিরস্ত্র নারী-পুরুষ, এমনকি শিশুদেরও হেনস্থা করছে, তা তিনি কড়া ভাষায় বলছেন।

সেই অর্থে ক্ষমা করে দেওয়ার আবেদন কোথাও নেই।

ক্ষমার হাস্যকর আবেদন বরং এসেছিল ইংরেজ তরফ থেকে, যেকথা আগেই উল্লেখ করেছি। গান্ধি বরং ক্ষমার কথা বলেছিলেন জালিয়ানওয়ালাবাগের ‘কসাই’ জেনারেল রেজিন্যাল্ড ডায়ারের সম্পর্কে। রবীন্দ্রনাথ প্রথম অংশে ‘ভগবানের দূত’ বলতে কাকে বুঝিয়েছেন, সেক্ষেত্রে কিছুটা হলেও তাই ধন্দ থেকে যায়। আসলে, রবীন্দ্রনাথের সাহিত্যের যে আবেদন, তা তো কখনোই কোনও বিশেষ ঘটনা বা ব্যক্তির মাঝে সীমাবদ্ধ থাকেনি। তাই এখানে সঠিকভাবে নির্দিষ্ট করে কাকে উদ্দেশ্য করেছিলেন, কোনও পার্থিব ব্যক্তিসত্ত্বা নাকি সর্বজনীন কোনও পরমাত্মা, তা গবেষণা-সাপেক্ষ। এখানে আলোচ্য নয়। এখানে আলোচ্য এই রাষ্ট্রীয় বর্বরতার বিরুদ্ধে তৎকালীন দেশবরেণ্যদের রাজনৈতিক অবস্থান।

৫ জুলাই, ২০২১। হিজলির হত্যাকাণ্ডের ৯০ বছর পূর্তি থেকে সওয়া দু’মাস আগে ভারতবাসী আবারও দেখল, রাষ্ট্র কীভাবে একজন অধিকার লড়াইয়ের সৈনিককে তিলে তিলে শেষ করল। তালোজা জেলে থাকাকালীন খাবারের জন্য স্ট্র চেয়েও একমাস অপেক্ষা করতে হয়েছিল ফাদার স্ট্যান স্বামীকে। রাষ্ট্র বিপ্লবীর স্ট্র-কেও ভয় পায়। মৃত্যুতে গর্জে উঠেছে প্রতিবাদী যুবসমাজ। ঠিক সেই মুহূর্তেই সোশ্যাল মিডিয়ায় ভেসে উঠেছে আরও একটি ট্যুইট। তিনি দুঃখিত। কেন দুঃখিত? কারণ, ‘দেশের বিরুদ্ধে গহৃত অপরাধ’ করা স্ট্যান স্বামীর ‘স্বাভাবিক মৃত্যু’ হল, কড়া শাস্তি পেয়ে মরতে হল না। দাঙ্গার প্রত্যক্ষ উস্কানি দিয়ে বুক বাজিয়ে ঘুরে বেড়ানো সেই বক্তাকে রাষ্ট্রীয় নীতিই স্পর্ধা দিয়েছে, দিনের পর দিন এভাবে তীব্র ঘৃণার বিষ ছড়িয়ে যাওয়ার।

স্ট্যান স্বামী

রবীন্দ্রনাথ তাঁর মনুমেন্টের মাঠে উচ্চাঙ্গ ভাষণে শেষে একটা প্রয়োজনীয় কথা বলেছিলেন – “এ কথাও আমাদের মনে রাখতে হবে, আমরা নিজের চিত্তে সেই গভীর শান্তি যেন রক্ষা করি, যাতে ক’রে পাপের মূলগত প্রতিকারের কথা চিন্তা করার স্থৈর্য আমাদের থাকে এবং নির্যাতিত ভ্রাতাদের কঠোর দুঃখ স্বীকারের প্রত্যুত্তরে আমরাও দুঃখ ও ত্যাগের জন্য প্রস্তুত হতে পারি।”

একই কথা তাঁর বিবৃতিতে বারবার বলেছিলেন গান্ধিজিও। ‘শান্তি’ ব্যাপারটা এখানে আপেক্ষিক। যে যেভাবে নেবেন। র‍্যাডিক্যালরা বলতেই পারেন, এই মুহূর্তে মনের শান্তির অবকাশ নেই। একটু তলিয়ে দেখলে বোঝা যাবে, এই শান্তি আসলে ঘোরতর প্রতিবাদের জন্যেও প্রয়োজনীয়। রবীন্দ্রনাথ প্রতিবাদ থেকে কিন্তু কখনোই সরে আসতে বলেননি।

বস্তুত, এই মানবপ্রেমী কবিও জীবনের শেষ কয়েকদিনে প্রশান্ত মহলানবিশের কাছ থেকে যুদ্ধের খবরে যখন শুনতেন, রাশিয়ার কাছে জার্মান সৈন্য পর্যুদস্ত হচ্ছে, তখন আনন্দ পেয়ে বলে উঠতেন – “পারবে, পারবে, ওরাই পারবে। ভারি অহঙ্কার হয়েছে হিটলারের। গোয়েরিং, গোয়েরিং – এখন দেখুক গোয়েরিং, কী হয়। দুশমনরা।” অর্থাৎ, সারাজীবন যিনি যুদ্ধের বিরোধী কথা বলে গেলেন, সশস্ত্র সংগ্রামকে মন থেকে মেনে নিতে পারেননি, তিনিও সেই যুদ্ধের হারজিতের খেলায় দুঃখ-আনন্দের মেরু-পরিবর্তনে সামিল হয়েছেন। কারণ একটাই, হারতে বসা লোকটির নাম অ্যাডলফ হিটলার।

আজকে শাসকদলের যে নেতাটি এই ধরনের কুৎসিত মন্তব্য করেন, একসময়ে তাঁদের অন্তিম পর্যায় যখন উপস্থিত হবে, সেই সময়ে তাঁদের প্রিয়জন বাদ দিয়ে দুঃখ করার মতো আর কেউ যে থাকবেন না, একথা সম্ভবত তাঁরা জানেন না।

রবীন্দ্রনাথের বক্তৃতার ওই শেষদিকের কথাটার দিকে একবার তাকাই। “প্রত্যুত্তরে আমরাও যেন কঠিনতর দুঃখ ও ত্যাগের জন্য প্রস্তুত হতে পারি।” স্ট্যান স্বামীর ‘হত্যা’র প্রতিবাদ সর্বতোভাবে দরকার, দাবি তোলা দরকার বিনা বিচারে আটকে থাকা অন্য সকল বন্দি অ্যাক্টিভিস্টদের। দাবি উঠেছেও। তাত্ত্বিক আলোচনার চেয়ে এই মুহূর্তে জোরালো প্রতিবাদের পাশাপাশি ওই ‘কঠিনতর দুঃখ ও ত্যাগের’ আরও বেশি প্রয়োজন। ক্রমাগত বিদ্বেষের বিষ ছড়াতে এই রাজনীতি আসলে সমগ্র সমাজের পক্ষে বিপদ, এই সারসত্যটা যতটা তাড়াতাড়ি বোঝা যায়, ততই মঙ্গল। এই মুহূর্তে রবীন্দ্রনাথ বা গান্ধির স্নেহাস্পদ অথচ বিরুদ্ধ-পথের পথিক সুভাষচন্দ্রের বিবৃতিও যেন কত আপন হয়ে ওঠে – “আমাদের বন্ধুদের জেলের মধ্যে কুকুর-বিড়ালের মতো গুলি করিয়া মারিবে, আর আমরা কি এখন বিবাদ-বিসংবাদে রত থাকিব?”

ইতিহাসে ধরা আছে পাঠ, শিক্ষাটা নিতে হবে বন্ধু।

তথ্যসূত্র –

“তপতী-অভিনয়পর্ব”, রবীন্দ্রজীবনী (তৃতীয় খণ্ড) – প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায়

Hijli Detention Camp to IIT: An Untold Saga – A documentary by Arnab Hazra

“হিজলি ও চট্টগ্রাম”, কালান্তর – রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

Collected Works of Mahatma Gandhi, Vol. 54 – Mohandas Karamchand Gandhi

বাইশে শ্রাবণ – নির্মলকুমারী মহলানবিশ

সোহম দাস

About author

Articles

গবেষক ও লেখক
সোহম দাস
Related posts
খবরদেশবিদেশ

ল্যাপটপে ভুয়ো নথি ঢুকিয়ে স্ট্যান স্বামীর বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র, বিস্ফোরক তথ্য মার্কিন রিপোর্টে

এলগার পরিষদ মামলায় গ্রেফতার হওয়া সমাজকর্মী স্ট্যান স্বামীর কমপিউটার হ্যাক করে নানা সন্দেহজনক তথ্য ঢুকিয়ে দেওয়া হয়েছিল। আমেরিকান এক ফরেন্সিক সংস্থার অনুসন্ধান অনুযায়ী, মাওবাদী এবং অতি বাম ঘেঁষা বেশ কিছু সংগঠনের সঙ্গে ৮৩ বছরের এই…
Read more
কলকাতাখবররাজ্য

আভিজাত্যে অমলিন পাথুরিয়াঘাটার 'বড় কালী', পুজোর সঙ্গে জড়িয়ে নেতাজি-বাঘাযতীনের নাম

ঐতিহ্যে ও আভিজাত্যে আজও অমলিন উত্তর কলকাতার পাথুরিয়াঘাটা সর্বজনীন কালীপুজো। মহান বিপ্লবী বাঘাযতীনের হাত ধরে এই পুজোর শুরু। তারপর একে একে আরও নাম যুক্ত হয়েছে পাথুরিয়াঘাটার ‘বড় কালী’র সঙ্গে। নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু, ভূপেন বোস, মহারাজা…
Read more
প্রবন্ধফিচারশিল্প-সংস্কৃতিসাহিত্য

আপন মনে এঁকেছিলেন ‘রবিকা’-র অন্তিম যাত্রা, রবীন্দ্রনাথ চলে গিয়েছিলেন অবনের জন্মদিনেই

তারিখটা ৭ আগস্ট, ১৯৪১। জোড়াসাঁকো তখন লোকে লোকারণ্য। একটু আগেই ‘রবিকাকা’ বিদায় নিয়েছেন চিরতরে। শোকে মুহ্যমান অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর দক্ষিণের বারান্দায় বসে আপন মনে এঁকে চলেছেন ছবি, তাঁর পরম প্রিয় রবিকাকার অন্তিমযাত্রার ছবি। খানিক পরে ফটক পেরিয়ে…
Read more

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *