ফিচারমনন-অনুধাবন

খড়দহে শ্রীশ্রীরাধাশ্যামসুন্দর মন্দিরের রাস উৎসব

“শ্যামের নাগাল পাইলাম না গো সই – ওগো মরমেতে মরে রই।”

বঙ্গ জীবনে নানা উৎসব আসে ঋতুকে ঘিরে। রাস উৎসব কার্তিক মাসের পূর্ণিমা তিথিতে পালন করা হয়। অদৃশ্য রসের দৃশ্যমান রূপ হল রাস। বৃন্দাবনে গোপিনীরা শ্রীকৃষ্ণের কাছে এসে একবার অনুযোগ করলেন যে তিনি শ্রীরাধার সাথেই শুধুমাত্র নৃত্য করেন। গোপিনীরা কেউ তাঁর সঙ্গ পান না। এরপর শ্রীকৃষ্ণ নিজের বহু মূর্তি ধারণ করে গোপীদের মাঝে প্রকট হয়ে তাদের সকলের সাথে নৃত্য করে সেই ইচ্ছা পূর্ণ করেন।

রাসমঞ্চ

একটি বৃত্তের মাঝে কৃষ্ণ বা রাধা সহ কৃষ্ণ ও নৃত্যরত গোপিনীরা অবস্থান করে চিত্রের মধ্যে দিয়ে। এছাড়া বাংলার একাধিক মন্দিরের দেওয়ালে রাস লীলার ভাস্কর্য রয়েছে। রাসের বিভিন্ন অবয়ব টেরাকোটার কাজে দেখা যায়।

নবদ্বীপ ও শান্তিপুরের পরেই কলকাতার উত্তরে খড়দহের রাস উৎসবকে ঘিরে বহু মানুষের সমাগম ঘটে। খড়দহে গোস্বামী পাড়ায় শ্রীশ্রীরাধাশ্যামসুন্দর মন্দিরের মূল আকর্ষণ রাস উৎসব। এখানকার প্রধান উৎসব রাস। চারদিন উৎসবকে ঘিরে সকল মানুষ আনন্দে মেতে ওঠেন। মন্দিরকে ঘিরে হরিনামের ঢেউ ছড়িয়ে পরে। কীর্তনের বোলে চারপাশ মুখরিত হয়। চারদিন রাধাশ্যামসুন্দরকে রাজবেশ, নটবর বেশ এবং রাখাল বেশে সাজিয়ে তোলা হয়। সবথেকে উল্লেখিত মন্দিরের পাশ দিয়ে একেবেঁকে সরু রাস্তা ধরে রাসখোলা ঘাটের কাছে সতেরো চূড়া বিশিষ্ট বিশাল রাস মঞ্চটি এখানকার আর এক আকর্ষণ।

পূজার নিয়ম অনুসারে বিগ্রহকে পালকি করে মূল মন্দির থেকে রাস মঞ্চে নিয়ে আসা হয়। সেখানেই পূজা ও ভোগের আয়োজন চলে, রাস মঞ্চের চারপাশে রাস মেলা বসে। এখানকার মেলাটিতে মহা-উৎসাহে গোটা সপ্তাহ জুড়ে মানুষের আনাগোনা থাকে। বর্তমানে করোনার সময়ে মেলার আয়োজন পরিসরে ছোটো হয়ে গেছে। এককালে উনিশ শতকে বাগবাজারের রুপচাঁদ পক্ষীর দল এখানে রাধাকৃষ্ণের গান, টপ্পা, ব্যঙ্গ, খেউর করে গেছেন। তিনি তার গানে আনন্দে সকলকে ডুবিয়ে রাখতেন। উইলিয়াম কেরি জলপথে এসেছিলেন খড়দহের রাসমেলা দেখতে। সেকালের নব্য বাবুরাও নৌকা করে এই খড়দহের রাসমেলা দেখতে আসতেন। তার সাথেই জলপথে চলতো আমোদ প্রমোদ। সময় বদলে গেলেও আজো পুরানো দিন গুলো স্মৃতি ভারে উজ্জ্বল হয়ে রয়েছে।

মুকুট তপাদার

About author

Articles

আলোকচিত্রী এবং লেখক। বাংলার হেরিটেজ নিয়ে কাজ করতে ভালোবাসেন।
মুকুট তপাদার

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *