গৃহস্থালিদৈনন্দিনফিচার

মুঘল আমলে পিঠের গায়ে থাকত ইতিহাস

শরৎকালের পরই আসে বাঙালির অত্যন্ত প্রিয় ঋতু হেমন্ত। হেমন্ত যদিও ঋতুচক্রের তালিকায় খুবই ক্ষণস্থায়ী, তবুও হেমন্ত আমাদের মনে এক অন্যরকম আনন্দের সৃষ্টি করে পিঠে পুলি, পাটিসাপটা আর হরেক রকম খাবারের মধ্যে দিয়ে। যা শীতকালে আরও বেড়ে যায়। নতুন চালের গুঁড়ো, নলেন গুড়ের পাকে জিভে জল আনা পিঠে খেতে কার না ভালো লাগে। কিন্তু বাংলার পিঠে তৈরির ইতিহাসের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা লোকসংস্কৃতি ও নান্দনিকতার কথা কি আমরা জানি!

বাংলার এই ঐতিহ্যবাহী প্রাচীন মিষ্টি ঘিরে গ্রাম-বাংলায় উৎসবের আমেজ তৈরি হয়। নবাবি আমলে বাংলায় প্রায় ৬০ থেকে ৭০ রকমের পিঠে তৈরির প্রচলন ছিল। নতুন চালের গুঁড়ো দিয়ে মাটির পাত্রে, জলে ভাপিয়ে সুস্বাদু পিঠে তৈরি করা হত। সাধারণত পৌষ মাসের যে শেষের দিন অর্থাৎ মকর সংক্রান্তিতে বাঙালির ঘরে ঘরে আনুষ্ঠানিকভাবে পিঠেপুলি খাবার প্রচলন চালু হয়ে আসছে বহুদিন থেকেই।

আরো পড়ুন : নলেন গুড় বানানো দেখেছেন কি?

তবে অগ্রহায়ণ মাসের প্রথম দিন থেকেও পিঠে পুলি খাওয়ার রীতি রয়েছে। একসময় গ্রাম বাংলার ঘরে-ঘরে মা বোনেরা চাল গুঁড়ো করে পিঠে বানাতে ব্যস্ত থাকতেন। পৌষ সংক্রান্তি অথবা পয়লা অঘ্রাণ বাংলার ঘরে ঘরে পিঠেপুলির প্রচলন থাকলেও গোটা শীতকাল জুড়েই বাঙালিরা পিঠে-পুলি উৎসব চালাতে থাকে।

নানান রকমের যে পিঠের প্রচলন আছে তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো ঝিনুক পিঠে, শিমুল পিঠে, পুলি পিঠে, নকশা পিঠে, চিতই পিঠে, ঝাল পিঠে, মালপোয়া পিঠে, চুষি পিঠে, সূর্যমুখী পিঠে ইত্যাদি। সেকালে পিঠের স্বাদের থেকেও বেশি গুরুত্বপূর্ণ ছিল পিঠের নকশা। পুলি পিঠের উপরে তৈরি নকশাই ছিল পিঠের আভিজাত্য বিস্তারের একমাত্র হাতিয়ার।

আরো পড়ুন : শ্রীরামপুরের ‘অলৌকিক’ গুটকে সন্দেশ

মুঘল আমলে রাজারা পিঠের কারিগরদের সম্মান করতেন শুধুমাত্র তাদের বৈচিত্র্যময় পিঠের জন্য। তাদের পিঠের গায়ে রাজ্যের ইতিহাস, ঐতিহ্য কিংবা চমৎকার প্রাকৃতিক নকশা অবধি তৈরি করা হত। পুলি পিঠে নকশা তৈরি করার জন্য সুবিধাজনক। পিঠেতে নকশা আঁকার জন্য খেজুরের কাঁটা, বাঁশ ব্যবহার করা হত। আধুনিকতার ছোঁয়া যতই লাগুক না কেন পিঠে পুলি, পাটিসাপটা বাঙালির মনের মধ্যে বেঁচে থাকবে। এ কথা স্বীকার করতেই হবে।

ভালোবাসার পক্ষে থাকুন, নিবিড়-এর সঙ্গে থাকুন

About author

Articles

সমাজ ও সংস্কৃতির বাংলা আন্তর্জাল পত্রিকা ‘নিবিড়’। বহুস্বর এবং জনগণের সক্রিয়তা আমাদের রাজনৈতিক অবস্থান।
নিবিড় ডেস্ক
Related posts
গৃহস্থালিফিচারমনন-অনুধাবন

ব্লেড আবিষ্কারের পেছনে রয়েছে বোতলের ছিপি

ব্লেড তৈরি করেছিলেন কিং ক্যাম্প জিলেট। ১৮৯০ সালে তিনি একটি বোতলের ছিপি বানানোর কোম্পানিতে সেলসম্যানের কাজ করতেন। তিনি লক্ষ্য করেন সবাই ব্যবহার করে ছিপি ফেলে দিচ্ছে অথচ এই সামান্য জিনিসটার ওপরেই পুরো কোম্পানি দাঁড়িয়ে আছে।…
Read more
ফিচারমনন-অনুধাবন

‘ব্লুটুথ’ কি আসলেই ‘নীল দাঁত’? নামের উৎস জানেন?

ব্লুটুথের কথা আমরা সবাই জানি। এ হল এক ধরনের ওয়্যারলেস টেকনোলজি যার মাধ্যমে ১০ থেকে ৫০০ মিটারের মধ্যে কোনওরকম ওয়্যার (তার) ছাড়া দুটো বা তার বেশি ডিভাইসের মধ্যে ডেটা ট্রান্সফার করা যায়। ১৯৯০ সালে নেদারল্যান্ডের…
Read more
ফিচারমনন-অনুধাবন

জলের ময়ূর থাকে গ্রাম বাংলায়, দেখেছেন কি?

ময়ূর পাখিটির সঙ্গে তো আমরা সবাই পরিচিত। পুরাণ মতে দেবতা কার্তিকের বাহন। আবার ভারতের ‘জাতীয় পাখি’র শিরোপা তার মাথায়। নীল রঙের গলা আর তার রঙিন লেজের বাহার। কিন্তু আজ, আমরা গল্প শুনব ‘জলময়ূর’-এর। ময়ূরের মত…
Read more

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *