শিল্প-সংস্কৃতি

সিনেমার ব্যাকরণ ছেড়ে বৃক্ষের ভাষা নিয়ে কাজ করেন বুদ্ধদেব দাশগুপ্ত

নিজের কর্মজীবন শুরু করেছিলেন অর্থনীতির অধ্যাপক হিসেবে বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয়ে। এবং কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়েও অর্থনীতিতে অধ্যাপনা করেছেন। এরই ফাঁকে উৎসাহ ছিল ফিল্ম স্টাডিজে। অর্থনৈতিক ও সামাজিক বিষয়ের বাস্তবতার উপর যা উপলব্ধি করেছিলেন সেটাই ছিল তাঁর সিনেমার প্রেক্ষাপট।

বুদ্ধদেব দাশগুপ্ত মৃত্যুতে বাংলা চলচ্চিত্র জগতে ও সাহিত্য জগতে এক সোনালি অধ্যায়ের অবসান হল । ১৯৪৪ সালে ১১ ফেব্রুয়ারি পুরুলিয়ার আনাড়া গ্রামে জন্ম তাঁর। বাবা তারাকান্ত দাশগুপ্ত ছিলেন রেলের চিকিৎসক। মাত্র ১২ বছর বয়সেই পড়াশোনার জন্য কলকাতা চলে আসেন বুদ্ধদেব। তারপরই অর্থনীতি নিয়ে পড়াশোনা স্কটিশ চার্চ ও কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে।

বুদ্ধদেব দাশগুপ্ত চলচ্চিত্র নির্মাণের পাশাপাশি কবিতাও লিখতেন। তাঁর চলচ্চিত্রেও কবিতার ছোঁয়া। বিখ্যাত কয়েকটি ছবি হল ‘বাঘ বাহাদুর’, ‘তাহাদের কথা’, ‘চরাচর’ ও ‘উত্তরা’। শ্রেষ্ঠ পাঁচটি চলচ্চিত্র ‘বাঘ বাহাদুর’ (১৯৮৯), ‘চরাচর’ (১৯৯৩), ‘লাল দরজা’ (১৯৯৭), ‘মন্দ মেয়ের উপাখ্যান’ (২০০২), ‘কালপুরুষ’ (২০০৮)। ‘দৌরাতওয়া’ (১৯৭৮)-এর জন্য জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার, এবং ‘তাহাদের কথা’ (১৯৯৩) বাংলাতে শ্রেষ্ঠ ফিচার ফিল্মের জন্য জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার জিতেছেন। পরিচালক হিসেবে তিনি ‘উত্তরা’ (২০০০) এবং ‘স্বপনের দিন’ (২০০৫)-এর জন্য দু’বার সেরা নির্দেশনার জন্য জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার জিতেছেন। চলচ্চিত্র পরিচালনার পাশাপশি সাহিত্য জগতেও তিনি ছিলেন উজ্জ্বল নক্ষত্র। বহু কবিতা উঠে এসেছে বুদ্ধদেবের কলমে, যা নিয়ে চর্চা আজও অব্যাহত। তার কাব্যগ্রন্থের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল ‘গভীর আড়ালে’, ‘কফিন কিংবা সুটকেস’, ‘হিমযুগ’, ‘ছাতা কাহিনি’, ‘রোবটের গান’, ‘শ্রেষ্ঠ কবিতা’, ‘ভোম্বোলের আশ্চর্য কাহিনি ও অন্যান্য কবিতা’।

মার্চ মাসে তিনি নতুন চিত্রনাট্য লিখছিলেন। এক মহিলা গোয়েন্দার গল্পের সুতো বুনতে বুনতে এক লহমায় সবটা শেষ। অবসরে কোনওদিনই বিশ্বাসী ছিলেন না বুদ্ধদেব। আর তাই হয়তো নিঃশব্দেই ঘুমের মধ্যে চিরদিনের মতো অবসর নিয়ে নিলেন চলচ্চিত্র জগতের উজ্জ্বল নক্ষত্র।

সালটা ১৯৬৮। মাত্র ১০ মিনিটের একটি ডকুমেন্টারি ‘দ্য কন্টিনেন্ট অফ লাভ’ দিয়ে চলচ্চিত্রে হাতেখড়ি। বিখ্যাত পরিচালক মৃণাল সেন, সত্যজিৎ রায় এবং ঋত্বিক ঘটকের যোগ্য উত্তরসূরী বলা হত বুদ্ধদেবকে। তাঁদেরকে অনুপ্রেরণা করেই এগিয়ে চলেছিলেন নিজের লক্ষ্যে।

‘বাঘ বাহাদুর’ ছবির দৃশ্য

সত্যজিৎ উত্তর যে ক’জন চলচ্চিত্রকার চলচ্চিত্রকে নতুনভাবে আবিষ্কার করতে চেয়েছেন, ভারতীয় চলচ্চিত্রের ভাষা বদলে দিয়েছেন। narrative structure কে ভেঙে দিয়ে স্বতন্ত্র জায়গা নিজেই ইনিস্টিউশন হয়েছেন, তাদের মধ্যে অন্যতম বুদ্ধদেব দাশগুপ্ত।

কিছুদিন আগে বাংলাদেশে একটি সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন:

“আমি সিনেমা করেছি পরে। আর আমি কবিতা লিখতে শুরু করেছি চোদ্দ বছর বয়স থেকে। ষোলো বছর বয়সে বুদ্ধদেব বসুর ‘কবিতা’ পত্রিকায় আমার প্রথম কবিতা বেরোয়। তারপর আরো অনেক পত্রিকায় লিখেছি। তারপর সিনেমা এসেছে। সিনেমাকে ভালোবেসেছিলাম আগে। কিন্তু সিনেমাই যে করব, আর কোনো কিছু করব না কবিতা লেখা ছাড়া সেটা ঠিক করেছিলাম অনেক পরে। কবিতা লিখতে গিয়ে যেটা আমার বারবার মনে হয়েছে এবং সিনেমা করতে গিয়ে মনে হয়েছে যে আমার নিজস্ব ভাষা দরকার। এমন কোনো ভাষা আমার দরকার যা একেবারেই আমার নিজের স্বর, আমার নিজের ভঙ্গি, আমার নিজের ভাষা। সেটা আমি কবিতাতেও এনেছি, নিজের সিনেমাতেও এনেছি। অনেকের ছবি দেখে আমি অনুপ্রাণিত হয়েছি, অনেকের ছবি আমার ভীষণ ভালো লেগেছে। এদেশের সত্যজিৎ, ঋত্বিক ঘটক তো আছেনই, বিদেশের তারকোভস্কি, বুনুয়েল। বিশেষ করে বুনুয়েল। এ কারণে বাস্তবকে ভাঙা, বাস্তবকে আরো বিস্তৃত করা, বাস্তবকে অতি বাস্তবের দিকে ঠেলে দেওয়া এটা বুনুয়েল যেভাবে করেছিলেন সেটা মনে হয় আর কেউ করেননি। আমি তাদের মতো ছবি করতে চাইনি। তাদের আমি ভালোবেসেছি, শ্রদ্ধা করেছি। কিন্তু আমি নিজের মতোই ছবি করতে চেয়েছি। বুনুয়েল আমার প্রিয় হলেও আমি নিজের মতন কাজ করি এবং কাজ করে যাই, ওটাই আমার স্টাইল। গ্লাসে একটু জল রাখলাম, তার সাথে একটু বাস্তবতা মেলালাম, তার সাথে একটু স্বপ্ন মেলালাম, তার সাথে একটু কবিতা মেলালাম তারপর যে shakeটা তৈরি হলো সেটাই আমার সিনেমা। মানে বাস্তবকে extended reality বলতে যা বুঝি আমরা সেটাই আমার সিনেমা, সেই সিনেমাই করে যাচ্ছি। এটা আমি দেখেছি যে অনেকেই এদেশে আমার মতন কাজ করতে চান, অনুসরণ করতে চান, কিন্তু এভাবে হয় না। এই সিনেমার ব্যাপারটা একদমই ভিতরের ব্যাপার, ভিতর থেকে উঠে আসার ব্যাপার।”

বুদ্ধদেবের ক্যামেরাশৈলী ও সম্পাদনার ব্লেন্ড আলাদা। কিছু কিছু সময়ে মন ভরে যায়। এ কি দেখছি – এ কি তারকোভস্কি?

আরেকটা সাক্ষাৎকারে ওঁর অকপটে মতামত:

“আসলে কোনটা যে আসল বাস্তব এই প্রশ্নটা আমাকে বারবার নিজেকেই করতে হয়। বাস্তব যেটা বলছিলাম সেটা কিন্তু খুব boring, খুব repeating। আমরা সকালে উঠেই প্রায়ই বলে দিতে পারি আজকে কি কি ঘটতে পারে। কিন্তু হঠাৎ এ বলে দেওয়াটা পাল্টে যায়। এই বাস্তবকে যদি চারদিক থেকে টানা যায় আমরা এক অদ্ভুত অতিবাস্তবতার দিকে চলে যাই। সেটা এই বাস্তবের ভিতরে লুকিয়ে ছিল, আমরা শুধু আবিষ্কার করতে পারিনি। যখন আবিষ্কার করতে পারি তখন এক অদ্ভুত ম্যাজিক নিজেদের মধ্যে গড়ে ওঠে। সেটাই আমার বড় জায়গা”।

একটা স্থির অরণ্য যেন তাঁর চলচ্চিত্র। গাছে বসে পাতার পাশ ফিরে শোওয়ার শব্দও যেন তিনি সংকলন করেন আর । ফিল্মি ব্যাকরণ ছেড়ে বৃক্ষের ভাষা নিয়ে কাজ শুরু করেন।

বুদ্ধদেব দাশগুপ্তর সঙ্গে যে কোনো কবির রোজ দেখা হয়। কিন্তু সেই সম্পর্ক অ-ছোঁয়া। তিনি ‘দূরত্ব’ রেখেই বলে চলেন, নিজের কাব্যভাষায় ঋদ্ধ হও। আমরা সকলেই চরাচরে থাকি। একঝাঁক অলীকের পাখি আমার ‘মেট্রোপলিটন মন ও মধ্যবিত্তের বিদ্রোহ’ হয়ে বেঁচে থাকা ভেদ করে বুকে গেছে আমারই অন্তরে হেজেমজে থাকা এক আশ্চর্য চরাচরে।

“লাবণ্য আমার সব ভুলে যেতে হবে এইবার।
ক্রমশ যাত্রার পথ বিভিন্ন সড়কে ভেঙে যায়,
তুমি কোন দিকে ফুটে ওঠো,সব দিক ঢেকে রাখে
বুকের আঁধার।”

উত্তান বন্দ্যোপাধ্যায়

About author

Articles

বিশিষ্ট লেখক, চলচ্চিত্রকার ও মানবাধিকার কর্মী
উত্তান বন্দ্যোপাধ্যায়

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *