রোলের দোকান বন্ধ করে ফুটপাত ঝাঁট দিয়ে যাচ্ছেন বয়স্ক বিহারী ভদ্রলোক একজন। ধুলোবালির মতো উড়ে যাই তার নারকেল শলার ঝাঁটায়। উড়তেই চোখে আসে, ফাঁকা হয়ে আসা লেক রোডের ফুটপাথের ধার ঘেঁষে সুখ-দুঃখের গল্প পাতিয়ে নিচ্ছে ময়লা রং বয়স্ক দম্পতি। তাদের সামনে সাজানো শসা কুচি আর ছোলা সেদ্ধ বাটির ধার দিয়ে হেঁটে যাওয়া লেক ফেরত কমবয়সী সন্ধে পেরনো দল। পিছনের রাস্তা দিয়ে সোজা হেঁটে গেলে বালিগঞ্জ গভর্নমেন্ট। পড়িমড়ি করে লাস্ট ক্লাস বাংক করে বেরোনো, যাতে চারটে কুড়ির ট্রেনে ফেরা লাল হেয়ার-ব্যান্ডকে একবার চোখের দেখা দেখে নেওয়া যায়। লাল হেয়ার-ব্যান্ডের সংসার এখন অন্যত্র। আমারও বাড়ি ফেরার তাড়া কই আর বিশেষ? ক্যাফেতে বসে ঘন্টা চারেক আড্ডা অগত্যা। উড়ান ভুলে স্বীকার করে নেওয়া নিজের না জানা অস্তিত্ব সমূহ। শহরের পথঘাট জুড়ে রডোডেনড্রন খোঁজার কথা ছিল একদিন। অথচ সেসব মনে করলে ভেজা পাতা অঞ্জলির মতো ছড়িয়ে পড়ে জল শুকিয়ে যাওয়া রাস্তায়। আমরাও মিহি মিহি গুঁড়ো হয়ে ভেসে যাই এদিক ওদিক। সমান্তরাল রেল লাইনের মতো সাজিয়ে নিই পাশাপাশি তাদের। অপেক্ষা করি একটা দূরপাল্লার আমাদের সব কিছু নিয়ে মাঝরাত ভেঙে এগিয়ে যাওয়ার আশায়। অথচ সিগন্যাল লাল থেকে সবুজ হলেই দেখতে পাই যত লোভী লোভী চোখ, কেমন ঈর্ষাকাতর। ঈর্ষা থেকে সবুজ সরিয়ে ছড়িয়ে দিতে ইচ্ছে হয় ফুটপাথের উপর নিভে আসা শেষবেলার ক্লান্ত বাজারে। ছড়িয়ে দিতে ইচ্ছে হয় হলুদ ট্যাক্সির গায়ে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা চোখেদের শরীর থেকে মমতার প্রলেপ। ইচ্ছে হয় সেসব গুছিয়ে নিয়ে ব্যাগে, নেটওয়ার্ক না থাকা মোবাইলের মতো গিয়ে দাঁড়াই তোমার উঠোনে। ইচ্ছে করে মাঝরাতে জাগিয়ে তুলি একটা রান্নাঘর। শুধু মাঝের এই স্বপ্নের মতো ঘুমের সময়টায় দাঁড়িয়ে থাকে একটা হাঁ করা প্রতীক্ষা। যে প্রতীক্ষায় অ্যানাউন্সমেন্ট হয়ে গেলেও, ট্রেন স্টেশনে ঢুকতে দেরি করে খুব।

শেষ বাস চলে গেলে, ঝুম ঝুম বৃষ্টিতে ছাতা টাঙিয়ে আবিষ্কার করা যায় তার সাটিন কাপড়ে কয়েক গুচ্ছ কীটের আদর দংশন। অগত্যা ছিদ্র। বৃষ্টি থামলে বরং বোঝা যায় পোকায় কাটা ছাতা নিয়েও আকাশের তারা গোনা যায় কী নির্দ্বিধায়! সোঁদা মাটির গন্ধ উঠলে পোস্টমাস্টারের পিছু পিছু হেঁটে পৌঁছে যাই জেটির ধার। চিঠি বোঝাই লঞ্চের অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে থাকি অনেকক্ষণ। মনে মনে বলি, আমাকে সাজিয়ে নাও ওই সব বর্ণমালার সব বর্ণচ্ছটাদের ভিতর। সাজিয়ে নাও, যেভাবে যৌবন হারিয়ে ফেলা শেষ কিছু পাতাদের ডালপালা থেকে ঝেড়ে ফেলে সেজে ওঠে কবেকার কাঠবাদাম গাছ। অপূর্ব সেই সাজ নিয়ে আমরা অতঃপর হেটে যাই বিউগল বাজানো অদৃশ্য কার্ফু জারি পথ ধরে। রেডিওতে বেজে ওঠে ‘লীলাবালি লীলাবালি’ আর প্রতিবার কার্ফুর পর ঘোর যুবতী সইয়ের ঘর থেকে নিখোঁজ হয়ে যায় কিছু মৃত সৈনিকের ছবি; রাত পাহারাদারের হুইসল। তবু বাতিঘর সাম্রাজ্যে অবিচল থাকতে হয় আমাদের। হাওয়াকলের পদক্ষেপে পদক্ষেপে বিলিয়ে দিতে হয় প্রেম। শেষ বাস চলে গেলেই বৃষ্টির শব্দে জেগে ওঠে ঝর্না, কলকল। সঙ্গে নিয়ে সেইসব চিরহরিৎ মেঘ, পাতার পোশাক সাজিয়ে আমরা হেঁটে যাই সারারাত, যেসব পাড়ায় তখন খুব বৃষ্টিচ্ছায় অঞ্চল।

হাতে হাত মিলিয়ে সরে আসি। এ যাবৎ সন্ধি স্থাপনে অভ্যাস ছিল না বহুকাল। দেশপ্রিয় পার্কের মোড়ে অটো থামিয়ে, চালকের সিটে বসে চাউমিন খুঁটে খায় ক্লান্ত যুবক। ট্রামলাইন ধরে সোজা তাকালে, সেই ড্যাবড্যাবে চাউমিন রঙেরই চাঁদ। দড়িতে ঝোলানো আগুন থেকে সিগারেট ধরালে শুনতে পাই, পিঠে ক্ষয়াটে ব্যাগ ঝুলিয়ে নিয়ে বয়স্ক এক মহিলা কাউকে অবুঝ বুঝিয়ে চলছেন অশৌচের নানান বাহানা। জেব্রা ক্রসিং পেরোনোর মুহূর্তে মালসা ভোগ জীবনের কাছে হাত পেতে ফেললে তৃতীয় লিঙ্গ, আরও সরল হয়ে যায় অবোধ স্বীকারোক্তি, “চাকরি নেই।” শুনে মৃত বাইচ ভেসে যায় মৃদু সরোবরের জলে। ওপারের বাড়িতে লখাইকে নিয়ে ফিরে এসেছে বেহুলা। তবু পদ্মবনের বাতাস বয়ে এলে, আজও বড় আনচান করে মান্দাস। হলুদ স্পিডব্রেকার পেরিয়ে গেলে বাম দিকে, ঘন ঘোর কালোয় দপ করে জ্বলে ওঠে কিশোরী মেয়ের সিঁথি ছুঁয়ে থাকা কিশোর আঙ্গুল। চাকরি চলে গেলে হঠাৎ, তাকিয়ে দেখার মতো অফুরান সময় আসে হাতে। অফুরন্ত সময় নিয়ে বিলিয়ে দিতে ইচ্ছে করে শুভেচ্ছা। ইচ্ছে করে বিলিয়ে দিতে নজরানা, লাস্ট ট্রেন, দিন খাই দিন আনি। কিশোর ছেলের আঙ্গুল ছুঁয়ে থাকা ভরাট সিঁথির মেয়ের জন্য জায়গা খুঁজি চিত্রনাট্যে। নায়িকার নাম দিই, সীমন্তিনী।

শুভদীপ চক্রবর্তী