মনন-অনুধাবনশিল্প-সংস্কৃতি

“বইটা সবার ভাল লাগবে”, বিতর্কের মধ্যেও আশার কথা বলছে ‘আমি রবীন্দ্রনাথ’

‘কুহেলিকা করি উদঘাটন’ রবীন্দ্রনাথ এলেন ফিরিয়া। তাই নিয়েই সরগরম নেট দুনিয়া। ‘আমি রবীন্দ্রনাথ’ নামক একটি সিনেমার ট্রেলার ফেসবুক আর ইউটিউবে এখন যথেষ্ট ভাইরাল, তার চেয়েও বেশি বিতর্কিত। একদল যেমন গোঁড়া রবীন্দ্র-আনুগত্য থেকে বেরিয়ে এসে এই কাজকে শুধুমাত্র একটি সিনেমা হিসাবেই দেখতে বলছেন, তেমন অনেকেই আবার গেল-গেল রব তুলছেন, আর বাকি জনতা মজেছে এই পুরো বিষয়টা নিয়ে মশকরায়। এমনই গুরুত্বপূর্ণ সময়ে দাঁড়িয়ে নিবিড় ডেস্ক মুখোমুখি হয়েছিল স্বয়ং রবীন্দ্রনাথের (থুড়ি, প্রসেনজিৎ দে-র)। তিনি নিজে কী মনে করেছেন, সিনেমা নিয়ে, ভবিষ্যৎ নিয়ে, তাঁকে ঘিরে তৈরি হওয়া বিতর্ক নিয়ে, সে সবের উত্তর দিলেন অকপটে। আজকের হটসিটে ‘গুরুবর টেগোর’, আর মুখোমুখি আমরা।

নিবিড় – আপনার অভিনয় জীবনের শুরু ঠিক কোথা থেকে?

রবীন্দ্রনাথ – শুরু বলতে, আমার তো ছোটবেলা থেকেই শখ হয়েছিল অভিনয় করার, কিন্তু সেভাবে কখনো করে উঠতে পারিনি। আমি এক জায়গায় একটা কোর্সও করেছিলাম, সেখান থেকেও কোনো প্লেসমেন্ট পাইনি। তারপর আমি মডেলিংয়ে ঢুকে গেলাম, তার জন্য বোম্বে চলে গিয়েছিলাম। সেখান থেকেই পরিচালক দাদাদের সঙ্গে যোগাযোগ হলো, ওরা বলল আমাকে নিয়ে এরকম কাজ করবে। আমি ফিরলাম, সেই অভিনয়ে আসা, তারপর দাদাদের সঙ্গে বেশ কিছু ছবি করেছি। তবে সেগুলো বেশিরভাগই ছোটো ক্যারেক্টার ছিল, কিন্তু এখন একেবারে মুখ্য চরিত্রে।

নিবিড় – পর্দায় চরিত্রটা ফুটিয়ে তোলার জন্য প্রস্তুতি নিয়েছেন কীভাবে?

রবীন্দ্রনাথ – আমাকে যখন প্রথম বলা হল রবীন্দ্রনাথ করতে, আমি তো যথারীতি খুবই ভয় পেয়ে গেছিলাম। তখন আমি দাদাদের বললাম, দেখো আমার দু-তিন মাস সময় লাগবে, একটু আমাকে লাইব্রেরি ওয়ার্ক করতে হবে। এই সময়টা জুড়ে আমি অনেক বই পড়লাম, রবীন্দ্রভারতী গেলাম, শান্তিনিকেতনে গেলাম, জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়িতে গেলাম। এগুলো যাওয়ার কারণ হচ্ছে আমি কবিগুরুকে বুঝতে চাইলাম। রবীন্দ্রনাথ চরিত্রটা করতে গেলে আমাকে ঠিক কেমন হয়ে উঠতে হবে আমি সেগুলোই শিখতে চেষ্টা করলাম। কিন্তু দেখলাম যে, ওনাকে বোঝা তো সম্ভব-অসম্ভবের থেকেও বড়ো কথা উনি একটা সমুদ্রের মতো, তাই ওনাকে বুঝতে গেলে হয়তো আমার সারা জীবনটাও কম পড়ে যাবে। তবু, মোটামুটি তিন মাস পর আমি যতটা নলেজ এক জায়গায় করতে পারলাম সেটা দিয়েই ভাবলাম এবার কাজটা শুরু করা যাক। কবিগুরুকে প্রণাম জানিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়লাম কাজে। তারপর দেখতে-দেখতে একদিন শুটিং শেষ করে ফেললাম। আর এখন তো ‘আমি রবীন্দ্রনাথ’।

নিবিড় – আচ্ছা, সিনেমার বিষয় হিসাবে রবীন্দ্রনাথকেই বাছা হলো কেন?

রবীন্দ্রনাথ – এ প্রশ্নের উত্তর দর্শক বন্ধুরা বইটা দেখলেই পেয়ে যাবেন। এখন ব্যাপার হচ্ছে ‘রবীন্দ্রনাথ’, তাঁকে কে না চেনে! আমাদের জন্ম থেকে শুরু করে, আমাদের জাতীয় সংগীত, রবীন্দ্রনাথকে চেনে না এমন মানুষ নেই। কিন্তু এই বইটার মাধ্যমে দর্শকরা জানতে পারবেন কবিগুরুর সম্পর্কে অনেক অজানা তথ্য। মানে এখানে আমরা রবীন্দ্রনাথের ছোটোবেলা থেকে কীভাবে সে বড়ো হয়েছে এবং বড়ো হয়ে তাঁর কীভাবে পড়াশোনায় এগিয়েছে বা তাঁর কবিতা লেখা কোথা দিয়ে শুরু হয়েছে? ছোটোবেলায় বাড়িতে সবার কাছে সে খুব একটা পছন্দের পাত্র ছিল না, কেননা সে অন্য ভাইবোনদের তুলনায় কতটা মেধাবী ছিল না এবং কাদম্বরীর সাথে তার কেমন ‘ফ্রেন্ডশিপ’ ছিল, কাদম্বরী কীভাবে তাকে প্রেরণা দিত সেগুলোই আমরা তুলে ধরেছি এই সিনেমায়। তারপর যখন কাদম্বরীর মৃত্যু হয় ও তখন অন্যরকম একটা খেয়ালে গিয়ে যে কবিতাগুলো লেখে আমরা তাও দেখিয়েছি। আসলে এখানে রবীন্দ্রনাথ তার নিজের কথাটাই বলছে।

ছবির একটি দৃশ্য

নিবিড় – নিজেকে রবীন্দ্রনাথ হিসেবে দেখে আপনার কেমন লাগছে?

রবীন্দ্রনাথ – সে তো খুবই ভালো লাগছে, ইতিমধ্যেই কিছু পোস্টার রাস্তায় পড়েছে বিভিন্ন জায়গায়, তাতেই যা কমেন্টস আমরা পাচ্ছি আমি অতটাও আশা করিনি, মানে আমার বেয়ন্ড এক্সপেক্টেশন। সোশ্যাল মিডিয়াতেও অনেকেই সেই ছবি দিয়ে অনেক ভালো কথা লিখছেন, ফলে অবশ্যই ভালো লাগছে, আর কি!

নিবিড় – সোশ্যাল মিডিয়ায় ভালো মন্তব্য যেমন আসছে, তেমন অনেকেই এটাকে নিয়ে মজাও তো করছেন, এই বিষয়টাকে কীভাবে দেখছেন?

রবীন্দ্রনাথ – এটা হবেই। দেখুন, সোশ্যাল মিডিয়া কারণ নিজের সম্পত্তি নয়, ওখানে যে যার মতামত রাখতেই পারে। খারাপ কথা হচ্ছে, অনেক মিমিক্রি হচ্ছে, কিন্তু সেই কথা বললে, এটা তো নরেন্দ্র মোদি, মমতা ব্যানার্জিকে নিয়েও হয়, সেখানে আমি কে? এবার একটা কাজ করে আমি যদি ভাবি একশোর মধ্যে একশোটা মানুষেরই ভালো লাগবে, সেটা তো হয় না। ভালো-খারাপ মিলিয়েই চলতে হবে। কিন্তু ওভার অল দেখতে গেলে খারাপের অ্যাভারেজটা অনেকটাই কম। আমাকে দেখতে হবে কাজটা আমি কী করছি, না আমি একটা সিনেমায় অভিনয় করেছি। কোনো ক্রাইম তো করিনি, এখন আমি দর্শকের সামনে এসেছি, কারোর ভালো লেগেছে, কারোর ভালো লাগেনি। সেটা আমি মাথা পেতে নেব কোনো অসুবিধা নেই।

‘আমি রবীন্দ্রনাথ ছবির ট্রেলার

নিবিড় – ভবিষ্যতে আমরা কি আপনাকে আরও এরকম চরিত্রে দেখতে পাব?

রবীন্দ্রনাথ – ব্যাপারটা হচ্ছে, সিনেমা করবো মানে ওই হিরো-হিরোইন দু’জন মিলে ভালোবাসাবাসি, মারামারি করে ভিলেনের সাথে ওই একঘেঁয়েমি, ওটা আমি চাই না। আমি চাই আমাদের দর্শকের কাছে কিছু নতুন আসবে, মানে একটু ‘হাটকে’ কিছু। যেমন ধরুন আজকে রক্তদান নিয়ে অনেকের মধ্যেই একটা খারাপ ধারনা আছে বা অনাথ বাচ্চারা যাদের মধ্যে হয়তো অনেক ট্যালেন্ট লুকিয়ে আছে। আমার মনে হয় এদের নিয়ে কিছু একটা কাজ করা উচিত এবং আমার কাছে সবথেকে ভালো মাধ্যম হচ্ছে সিনেমা। দর্শককে একটা এমন মেসেজ দেওয়া, যেটা দেখে দর্শক ভাববে যে আমাদের সকলেরই এগিয়ে আসা উচিত, তাই জন্য আমি একটু ‘হাটকে’ সিনেমা করাটাই বেশি পছন্দ করব।

নিবিড় – ‘আমি রবীন্দ্রনাথ’ দর্শকদের কেমন লাগবে বলে আপনার মনে হয়?

রবীন্দ্রনাথ – এটার বিচার তো আমি নয়, দর্শকই করবেন। তবে আমাদের আশা, এই বইটা সবার ভালো লাগবে। এই মুহূর্তে যে কন্ট্রোভার্সিগুলো হচ্ছে, সিনেমা রিলিজের পর সেগুলো আর থাকবে না। কেননা এখানে খুবই ভালো একটা কাজ তুলে ধরার চেষ্টা করা হয়েছে। তাই দর্শক বন্ধুদের অনুরোধ করবো আপনারা হলে এসে বইটা দেখুন এবং আপনাদের মতামত জানান।

(‘আমি রবীন্দ্রনাথ’ ছবিটি প্রেক্ষাগৃহে মুক্তি পাচ্ছে ২৬ মার্চ, শুক্রবার)

নিবিড় ডেস্ক

About author

Articles

সমাজ ও সংস্কৃতির বাংলা আন্তর্জাল পত্রিকা ‘নিবিড়’। বহুস্বর এবং জনগণের সক্রিয়তা আমাদের রাজনৈতিক অবস্থান।
নিবিড় ডেস্ক

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *