গৃহস্থালিদৈনন্দিনফিচার

শ্রীরামপুরের ‘অলৌকিক’ গুটকে সন্দেশ

মিষ্টির নাম শুনলেই মুখে হাসি ফুটে উঠবে না এমন বাঙালি খুব কমই আছে। তা সে শক্তিগড়ের ‘ল্যাংচা’ হোক, বা কলকাতার ‘রসগোল্লা’, বর্ধমানের ‘সীতাভোগ’ বা জয়নগরের ‘মোয়া’। বাঙালির সাথে মিষ্টির আবেগ জড়িয়ে রয়েছে। তেমনই এক আঞ্চলিক মিষ্টি, শ্রীরামপুরের ‘গুটকে সন্দেশ’। দেখতে ততটা এলাহি না হলেও এর প্রাচীনত্ব বেশ অনেকখানি।

ছোটো ছোটো দুটি কড়া পাকের সন্দেশের খণ্ড, দেখতে অনেকটা লুচির লেচির মতন। জুড়ে দিলেই তৈরি গুটকে সন্দেশ। স্বাদও অসাধারণ। ছানার তৈরি সন্দেশ, মুখে দিলেই গলে যায়! তবে গুটকে সন্দেশ কিন্তু শ্রীরামপুরের সর্বত্র পাবেন না। এদের মধ্যে সর্বাপেক্ষা প্রসিদ্ধ হল মহেশচন্দ্র দত্তর দোকান। যে কোনও পূজাপার্বণে, বিশেষ করে রাধাবল্লভের পুজোয় এই মিষ্টি খুবই প্রচলিত। দোকানে কোনো ভাজা মিষ্টি তৈরি হয়না, কারণ রাধাবল্লভ ভাজা প্রসাদ গ্রহণ করেন না।

আরো পড়ুন : পঞ্চকোট রাজার আদেশে তৈরি হল কস্তার লাড্ডু

১২৩২ বঙ্গাব্দে এই দোকানটি প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল, অর্থাৎ প্রায় দুই শতাব্দী প্রাচীন একটি মিষ্টির দোকান। এর সৃষ্টিকর্তা মহেশচন্দ্র দত্ত, তাঁর নামেই দোকানটি। মানিকতলার প্রাচীন রাধাবল্লভের মন্দিরের সঙ্গে এক আত্মিক সম্পর্ক রয়েছে এই দোকানের। রয়েছে এক জনপ্রিয় গল্পও। সে অনেক আগেকার কথা। মহেশচন্দ্র দত্ত সবে সবে সন্দেশ বিক্রি শুরু করেছেন। তখন একটি ছোট্ট বালক দোকানে এসেছিল গুটকে সন্দেশ খাবে বলে। বালকটির কাছে পয়সা-কড়ি কিছু ছিল না।

ক্ষুধার্ত বালক তখন তার হাতের সোনার বালাটি বন্ধক দিয়ে মহেশচন্দ্রের কাছ থেকে গুটকে সন্দেশ খায়। পরের দিন রাধাবল্লভ মন্দিরের একজন পুরোহিত একটি বিস্ময়কর বিষয় লক্ষ্য করেন। রাধাবল্লভ ঠাকুরের হাতের সোনার বালাটি উধাও। সবাই ধরে নেয় বালাটি চুরি হয়ে গেছে। পরের দিনই পুরোহিত মশাই ওই সোনার বালাটি মহেশচন্দ্র দত্তের কাছে আবিষ্কার করেন। তিনি টাকা দিয়ে বালাটি ছাড়িয়ে নিয়ে আসেন।

আরো পড়ুন : নলেন গুড় বানানো দেখেছেন কি?

এই গুটকে আসলে কড়াপাকের সন্দেশ। ছানা ও চিনি যার উপকরণ। শীতকালে খেজুরের গুড় দেওয়া হয় চিনির বদলে। দু’টো সন্দেশ একসঙ্গে জোড়া থাকে। কলকাতায় এমন কত প্রাচীন মিষ্টির দোকান আছে। বিশাল বয়স তাদের। রূপও তেমনি। আর মিষ্টির কী বাহার! এতগুলো পদ, এক নিঃশ্বাসে বলাই যাবে না। মিষ্টির ময়রার কাজ কোথাও কোথাও যদিও যন্ত্রই নিয়ে নিয়েছে। কিন্তু শ্রীরামপুরের এই মিষ্টির দোকানটি আজও তাদের প্রাচীন ঐতিহ্য বয়ে নিয়ে চলেছে।

ভালোবাসার পক্ষে থাকুন, নিবিড়-এর সঙ্গে থাকুন

ছবি – মুকুট তপাদার

About author

Articles

সমাজ ও সংস্কৃতির বাংলা আন্তর্জাল পত্রিকা ‘নিবিড়’। বহুস্বর এবং জনগণের সক্রিয়তা আমাদের রাজনৈতিক অবস্থান।
নিবিড় ডেস্ক
Related posts
ফিচারমনন-অনুধাবন

জলের ময়ূর থাকে গ্রাম বাংলায়, দেখেছেন কি?

ময়ূর পাখিটির সঙ্গে তো আমরা সবাই পরিচিত। পুরাণ মতে দেবতা কার্তিকের বাহন। আবার ভারতের ‘জাতীয় পাখি’র শিরোপা তার মাথায়। নীল রঙের গলা আর তার রঙিন লেজের বাহার। কিন্তু আজ, আমরা গল্প শুনব ‘জলময়ূর’-এর। ময়ূরের মত…
Read more
গৃহস্থালিফিচারমনন-অনুধাবন

বগুড়ার মায়াবী দইয়ের খ্যাতি বিশ্বজোড়া

বাংলাদেশের বগুড়াকে দইয়ের শহর বলা হয়। সেখানকার দইয়ের খ্যাতি বিশ্বজোড়া। শুধু দইকে কেন্দ্র করেই এই জেলা পেয়েছে ভিন্ন পরিচিতি। স্বাদে অতুলনীয় হওয়ায় বগুড়ার দইয়ের জনপ্রিয়তা যুগ যুগ ধরে অটুট। প্রতিদিন বিভিন্ন অঞ্চলে বিক্রি হয় বগুড়ার…
Read more
ফিচারভ্রমণমনন-অনুধাবন

মেদিনীপুরে ফুলের স্বর্গরাজ্য

যতদূর চোখ যাবে, শুধুই বিভিন্ন ধরনের ফুল আর ফুল। দেখে মনে হবে এ যেন ফুলের স্বর্গরাজ্য। বর্তমানে পর্যটকদের অন্যতম ডেস্টিনেশন এটি। যদি কেউ চাক্ষুষ করতে চান, তবে চলে যেতে পারেন পূর্ব মেদিনীপুরের ক্ষীরাই। ফুল উৎপাদনে…
Read more

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *