প্রবন্ধমনন-অনুধাবন

নরেন্দ্র মোদির ঘোষণা কি কর্পোরেট পুঁজির নতুন ষড়যন্ত্র?

১) মোদি সরকারের নাটক না ভোটের অংক

নরেন্দ্র মোদি সরকার তিনটি বিষাক্ত কালো কৃষি আইন বাতিল করবে জানাল। দেশবাসীর কাছে ক্ষমা চাইল। কিন্তু কেন? কেউ বলছেন দর্পচূর্ণ – ‘অতি দর্পে হত লংকা’, কেউ বলছেন নাটক, তবে প্রায় সকলেই একমত যে সামনে উত্তর ভারতের নানা রাজ্যে বিধানসভা নির্বাচন এবং সে নির্বাচন যত এগিয়ে আসছে বিজেপি ততই সে সব রাজ্যে ক্ষমতা হারানোর মতো এক সাংঘাতিক বিপদের সংকেত পাচ্ছে। তাই কি ক্ষমতা হারানোর ভয় পেয়ে মোদি এমন কাজ করলেন? নাকি এর পেছনে আছে অন্য কোনো অংক?

সাধারণ ভোটাররা যে মোদি সরকারের ওপর আস্থা ও বিশ্বাস হারিয়েছে, সাধারণের প্রশ্ন, সাধারণের আন্দোলন থেকেই তা স্পষ্ট। কেউ আন্দোলন করছেন নাগরিক অধিকার ও আত্মসম্মান চেয়ে, কেউ আন্দোলন করছেন নাগরিকত্ব আইন প্রত্যাহারের দাবিতে, কেউ কৃষি আইন বাতিলের দাবিতে, কেউ চাইছে সংবিধান ও গণতন্ত্রের পুনঃপ্রতিষ্ঠা, কেউ চাইছে খাদ্য, বস্ত্র বা ছাদের নিশ্চয়তা।

২. দেশের সরকার ও নাগরিক

যে স্বৈরাচারী সরকার তার নাগরিকদের মানুষ বলে গণ্য করে না তাদের প্রধান ক্ষমা চাইলে চোখ তো কপালে ওঠেই। তাই তো সাধারণের মনে আজ আরও অনেক প্রশ্ন। যারা প্রাণ দিল এই আন্দোলনে তাদের কি সরকার দেশদ্রোহী বা সন্ত্রাসী বা পাকিস্তানের অনুচর না বলে এরপর ক্ষতিপূরণ দেবে? লখিমপুরে দুর্বিনীত যে মন্ত্রীপুত্র প্রতিবাদী কৃষকদের নিজের গাড়ির চাকার তলায় পিষে মারল, সেই মন্ত্রীকে কী প্রধানমন্ত্রী অন্তত বলবেন সরে যাও। অথবা তিনি বিমুদ্রাকরণের ভুল স্বীকার করবেন। এমন আরও বেশ কিছু প্রশ্ন বা সংশয় নিয়ে, তার মনুষ্যজীবনের অসম্মান, ক্ষোভ – দুঃখ আর দারিদ্রকে পাশে নিয়ে মানুষ জীবনযাপন করছে। করতে বাধ্য হচ্ছে। বিরোধীরা আজ তাদের হয়ে সে সব কথা বলছে। কতদিন তারা পাশে থাকবে? ভোট ফুরোলে থাকবে তো, নাকি কর্পোরেট পুঁজির নির্দেশে নৌকা বদলাবে?

আরও পড়ুন : তিন কৃষি আইন প্রত্যাহার, ক্ষমা চেয়ে ঘোষণা নরেন্দ্র মোদির, যদিও থামছে না কৃষক আন্দোলন

কর্পোরেট পুঁজিও কি নৌকা বদলাবে? নতুবা মোদি সরকারের পক্ষে থাকা কর্পোরেট দুনিয়াই বা মোদিকে এমন পদক্ষেপ করায় সাহায্য করবে কেন? তাদের মদতেই তো এমন দুর্বিনীত হয়েছেন এই প্রধানমন্ত্রী। দর্পে বেড়েছে বুঝি তার ছাতির মাপ, ভুলিয়ে দিয়েছে তার হাতের রক্তের দাগ! তারা না চাইলে প্রধানমন্ত্রী ক্ষমা চাওয়ার এই নাটুকে ভঙ্গিও করতেন কি? তাদের তুষ্ট করতেই মানুষকে তিনি আর মানুষ বলে গণ্য করেন না! তিনি স্পষ্ট না বললেও মানুষ বুঝতে পারছে তার ‘সবকা সাথ, সবকা বিকাশ’ স্লোগানের অর্থ। তারা তবু তাঁকে পুরো ভরসা করছেন না আর! তা বলে কর্পোরেট তো দেশ ছেড়ে যেতে পারে না। ওরা অনেক পুঁজি বিনিয়োগ করেছে এই দেশে, দেশের কৃষিখাতে, কৃষিপ্রধান দেশকে শিল্পোন্নত করতে৷ দ্রুত জিডিপি বাড়াতে তারা লড়ে যাচ্ছে। পরিবেশ ধ্বংস হলে হোক। কৃষিপ্রধান এই দেশকে তারা শিল্পোন্নত দেশে পরিণত করতে চায়। মুনাফা চাই তাদের যে কোনো মূল্যে। মোদি ব্যর্থ হলে তার বিরোধীদের পাশে দাঁড়াতে চায় কর্পোরেট পুঁজি! কিন্তু, মোদি যদি ব্যর্থ না হয়। পুঁজি তাই এক গর্তে সব বল রাখতে চায় না। কে থাকল ক্ষমতায় তাতে তার কিছু আসে যায় না।

৩) কর্পোরেট পুঁজি

কর্পোরেট পুঁজি সময় চায়। দেখার বিষয় এই যে মোদি সরকার এই তিন কালা কানুন বাতিল করতে কত সময় নেয়। ইতিমধ্যে কৃষক যদি তার ফসলের জন্য ন্যায্য মূল্য না পায়, সরকার যদি ন্যূনতম মূল্য ঘোষণা না করে তবে কৃষকদের থেকে কম দামে ফসল কিনে কর্পোরেট পুঁজি বেশ কিছুটা ধাক্কা সামলে নেবে। তারপর অপেক্ষা করবে মোদির পরবর্তী চালের জন্য। লোকটা যে চালবাজ তাতে তো কোনও সন্দেহ নেই কারও। বিরোধীরা এই মুহূর্তে ক্ষমতা পাবে না এটা সকলে বুঝে গেছে। এই রাজ্যে এখনই চুক্তিচাষ সম্পর্কিত বিধি গৃহীত, অন্য রাজ্যগুলি কী করবে? এই রাজ্যের শাসকদল রাজ্যে রাজ্যে বিরোধীদের ভোটে ভাগ বসাতে এগোচ্ছে। ভোট ভাগ হলে মোদির আসন যেমন আছে তেমন থাকবে, নইলে যাবে। তাই বুঝি কর্পোরেট পুঁজির চিন্তা নেই, তারা মোদিজিকে বলতে পারছে মাভৈঃ। এগিয়ে চলো, পুঁজি তোমার পাশে আছে।

অশোকেন্দু সেনগুপ্ত

প্রবন্ধমনন-অনুধাবন

বাংলায় এত অশিক্ষিত কেউ বাস করেন বুঝি!

Worth reading...