গৃহস্থালিদৈনন্দিন

দেশ-বিদেশের আইসক্রিম – সে এক রূপকথার জগৎ

আট থেকে আশি – আইসক্রিম সকলেরই প্রিয়। বিয়েবাড়ি হোক বা জন্মদিন, শেষ পাতে যত রকমই মিষ্টি থাকুক না কেন, আইসক্রিম না থাকলে নেমতন্ন কিন্তু একটু ফিকে হয়ে যায় বইকি! তা সে কাপ আইসক্রিমই হোক বা বার আইসক্রিম।

কিন্তু এই আইসক্রিম এর সূচনা কবে? গ্যাস্ট্রোনমির ইতিহাসে চিনে প্রায় ৬১৮-৬১৭ খ্রিস্টপূর্বাব্দে শাং সাম্রাজ্যের সম্রাট রাজা টাং এর শাসনকালে প্রথম আইসক্রিম পাওয়া যায়। বলা হয় তাঁর নিজস্ব বাহিনী ছিল ৯৪ জনের, যারা শুধুমাত্র তাঁর জন্য আইসক্রিম প্রস্তুত করত মোষের দুধ, ময়দা ও কর্পূর দিয়ে। এরপর ২০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দে বরফের মধ্যে দুধ আর চালের গুড়োর মিশ্রণ জমিয়ে রেখে আইসক্রিম তৈরির নিদর্শনও মেলে চিন ও তাইওয়ানে।

১৪ শতকে ইউরোপে পর্যটক মার্কো পোলোর হাত ধরে আইসক্রিমের প্রসার ঘটে। আমেরিকায় আইসক্রিম প্রথম পরিবেশন করেন ওয়াশিংটনে রাষ্ট্রপতির নৈশভোজে টমাস জেফারসন নামের এক শেফ। এরপর থেকেই আইসক্রিম আমেরিকায় জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। ১৮৯৪ সালে শুরু হয় শিল্প হিসেবে আইসক্রিমের উৎপাদন।

আধুনিক সময়ে আইসক্রিমের সর্বাধিক গ্রাহক হল আমেরিকা। সেই দেশের ৯৪ শতাংশ মানুষের ফ্রিজারে আইসক্রিম থাকবেই। আর সবচেয়ে জনপ্রিয় আইসক্রিম ফ্লেভার ভ্যানিলা।

বিভিন্ন দেশে আইসক্রিমের ভিন্নতা বিশেষভাবে লক্ষণীয় –

আমেরিকায় ভীষণ জনপ্রিয় রোলার আইসক্রিম। কিন্তু এই আইসক্রিমের উৎপত্তি দক্ষিণপূর্ব এশিয়ায় (থাইল্যান্ড, মালেশিয়া, কাম্বোডিয়া, ফিলিপিন্স)। একটি স্টিলের কোল্ডপ্লেটে দুধ বা হেভিক্রিম ঢেলে তার ওপর বিভিন্ন ফল বা টপিং যেমন স্ট্রবেরি, কিউয়ি, চকো চিপস্ বা রেনবো স্প্রিঙ্কল দিয়ে সেগুলিকে স্প্যাচুলার সাহায্যে মেশানো হয়। কোল্ডপ্লেটটির উষ্ণতা হিমাঙ্কের নিচে থাকায় এটি খুব সহজেই জমে যায়। তারপর রোল করে কাপে সাজিয়ে এটি পরিবেশন করা হয়। পুরো ঘটনাটি মাত্র ২ মিনিটে শেষ করা যায়। প্রিজারভেটিভ না থাকায় এটি খুবই স্বাস্থ্যসম্মত।

সফট সার্ভ প্রথম পাওয়া যায় ১৯৩০ সালে আমেরিকায়। ভীষণ নরম ও প্রায় ভেলভেট মসৃণ এই আইসক্রিম ওয়েফার কোণের মধ্যে সার্ভ করা হয়।

১৯৮১ সালে ইয়োগার্টকে আইসক্রিমের মতো জমিয়ে স্কুপ করে কাপের মধ্যে রেখে বিভিন্ন টপিং দিয়ে এটি সার্ভ করা হয়। টক মিষ্টি স্বাদের এই ডেজার্টে খুব কম ফ্যাট থাকায় এটি খুব স্বাস্হ্যসম্মত।

স্নো ক্রিম আমাদের বরফের গোলার বিদেশি রূপ, তাইওয়ানে প্রথম পাওয়া যায়। দুধ ও জলের সমান মিশ্রণকে বরফের মতো জমিয়ে তাকে শেভ করে একটি বাটিতে নিয়ে তার ওপর সিরাপ, ফলের টুকরো, কন্ডেন্স মিল্ক, চকোচিপস্ দিয়ে সার্ভ করা হয়।

জিলাটো ভীষণ জনপ্রিয় ইতালিয়ান আইসক্রিম। সাধারণ আইসক্রিমের মতো হলেও এটি বেশি দুধ দিয়ে তৈরি ও ভীষণ গাঢ়। কারণ এতে হাওয়ার পরিমাণ খুবই কম।

দুধ গাঢ় করে তারমধ্যে কেশর, এলাচ, গোলাপ জল, ড্রাই ফ্রুট মিশিয়ে জমাট বাঁধিয়ে তৈরি করা হয় এই ভীষণ জনপ্রিয় কুলফি। কাঠির সাহায্যে বা কেটে বিভিন্ন টপিং যেমন সিরাপ, সেমাই সহযোগে পরিবেশিত হয় এটি।

যারা আইসক্রিম ভালোবাসেন অথচ ল্যাকটোজ ইনটরালেন্ট, তাদের কাছে সর্বে ভীষণ পছন্দের। আমেরিকায় প্রথম তৈরি হয় এটি। বিভিন্ন ফলকে কেটে ফ্রিজারে জমিয়ে তারপর ঐ জমাট বাঁধা ফলকে মধুর সাথে ক্রাশ করে আবার জমিয়ে রেখে স্কুপ করে পরিবেশন করা হয়। ল্যাকটোজ ইনটরালেন্টরা ছাড়াও ডায়াবেটিকরাও এটি উপভোগ করতে পারেন।

ইরানের প্রসিদ্ধ আইসক্রিম ফালুদা। আইসক্রিমের ছোট টুকরোকে গ্লাসের মধ্যে রেখে তার ওপর গোলাপ জল, সিরাপ, লেবুর রস, সেমাই দিয়ে সার্ভ করা হয়। তবে ভারতের অলিগলিতে যে ফালুদা বিক্রি হয় তা কিছুটা আলাদা। এই ফালুদাও কাঁচের গ্লাসে বিক্রি হয় তবে আইসক্রিমের টুকরোর ওপর ঘন ক্ষীর, সেমাই ও সিরাপ দেওয়া হয়।

তুরস্কের আইসক্রিম দোনদ্রামা। যা সাধারণ আইসক্রিমের থেকে অনেকটাই আলাদা। সাবুর আটা দিয়ে তৈরি এই আইসক্রিম আঠালো ধরনের। পরিবেশনের ধরন বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।

সিসিলিতে তৈরী হয় গ্রানিটা আইসক্রিম। চিনি ও জলের মিশ্রণকে জমাট বাঁধিয়ে তা একটি বাটিতে গুঁড়ো করে রেখে ফলের টুকরো, বাদাম ও হার্ব দিয়ে সার্ভ করা হয়।

জাপানের জনপ্রিয় আইসক্রিম মোচি। চালের আটার মিশ্রণ দিয়ে আইসক্রিমটি মোড়ানো থাকে। বিভিন্ন ফ্লেভারের হয় এটি। যেমন গ্রিন টি, মিসো অথবা ভ্যানিলা বিন। ইতালিয়ান আইস একটি ডেয়ারি ফ্রি আইসক্রিম। সাধারণত ডিমের সাদা অংশ ব্যবহার করা হয় এতে। চেরি, ব্লুবেরি, তরমুজ ফ্লেভারে পাওয়া যায়।

ইতালিয়ান আইস একটি ডেয়ারি ফ্রি আইসক্রিম। সাধারণত ডিমের সাদা অংশ ব্যবহার করা হয় এতে। চেরি, ব্লুবেরি, তরমুজ ফ্লেভারে পাওয়া যায়।

অন্বেষা সেনগুপ্ত