কলকাতাপ্রবন্ধভোটবাদ্যি ২০২১মনন-অনুধাবন

কফিখানায় কপিহানা – বইপাড়াকে ‘মোদিপাড়া’ করার পরিকল্পিত ফ্যাসিস্ট পদক্ষেপ

লালমোহনবাবু ওরফে জটায়ুকে মনে আছে? যিনি রহস্য উপন্যাসের নাম রাখতেন ‘সাহারায় শিহরণ’ কিংবা ‘হন্ডুরাসের হাহাকার’। তিনি যদি সাংবাদিক হতেন তবে কফি হাউসে গেরুয়া হামলার নাম রাখতেন ‘কফিখানায় কপিহানা’, এবিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই।

কপিরাজ বজরংবলি যাদের পূজ্য দেবতা, তাদের কয়েকটি তরুণ শাবক গেরুয়া উর্দি পরে কফিখানায় খানিক হুপ হাপ করে বিদায় নিয়েছে। হুমকি দিয়ে গিয়েছিল পরদিন তারা সশস্ত্র হয়ে আসবে। আজ তারা শুধু ‘নো ভোট টু বিজেপি’ পোস্টার ছিঁড়েছে, পরদিন বিজেপি বিরোধীদের মেরুদন্ড ভেঙ্গে দিয়ে দেখাবে ‘হিন্দুত্বের শক্তি’।

পরের দিনটা যথারীতি এল, প্রতিবাদী ছাত্রযুব ও সাধারণ মানুষের ঢল নামল কলেজ স্ট্রিট জুড়ে। কিন্তু হিন্দুত্বের শক্তির লেজের ডগাটাও দেখা গেল না।

প্রশ্ন হল, কফিখানায় কপিহানার উদ্দেশ্য কী? হঠাৎ করে কয়েকজন কপিধ্বজ যুবকের রাগের প্রকাশ, না পেছনে পাকামাথাদের পরিস্থিতি বাজিয়ে দেখার পরিকল্পিত মতলব ছিল?

এটা কি ভোটের আশু প্রচারের আবহের সঙ্গে যুক্ত, না আরএসএস-এর ভবিষ্যৎ কর্মসূচির একটা ঝিলিক?

আমাদের নিশ্চিত বিশ্বাস, এটা কয়েকজন বালখিল্যের হঠাৎ উন্মাদনা নয়। আরএসএস মার্কা ফৌজি সংগঠনে এরকমটা ঘটার কথা নয়। এটা একটা পরীক্ষামূলক ফ্যাসিস্ট পদক্ষেপ। শুধুমাত্র ভোটের মতলবে নয়, ক্ষমতায় এলে (যদিও তার কোনো সম্ভাবনা নেই) তারা যা ঘটাবে তার একটা ঝাঁকি দর্শন ঘটাতে চেয়েছিল।

ফ্যাসিস্ট দলের একটা বৈশিষ্ট্য, বেসরকারি সংগঠিত গুন্ডাবাহিনী। মুসোলিনির ছিল ব্ল্যাক শার্ট, হিটলারের ব্রাউন শার্ট, বিজেপির কপিবাহিনী গেরুয়া টি-শার্ট পরে এসেছিল।

কালোকামিজওয়ালাদের মুখে ছিল প্রিয় নেতার জয়ধ্বনি “দুচে, দুচে”। বাদামি উর্দিধারীরা চেঁচাত, “হেইল হিটলার, হেইল হিটলার” বলে। কপি বাহিনীর মুখে আমরা শুনছি “মোদি, মোদি”।

স্থানটাও তাদের দিক থেকে সুনির্বাচিত। বইপাড়ার কেন্দ্রের কফিহাউস। বুদ্ধিজীবীদের খোলামেলা আড্ডার জায়গা হিসেবে পরিচিত। বৌদ্ধিক চর্চার ফুলকি ছকভেঙে ওড়েও বটে। ফ্যাসিস্টরা বুদ্ধিজীবীদের দু-চক্ষে দেখতে পারে না। কারণ তারা শুধু প্রশ্ন তোলে। এত প্রশ্ন কেন? দেশনায়কের কথায় প্রশ্নহীন আনুগত্য রাখো, এটাই তো দেশপ্রেমিকের সৎজীবন।

কফি হাউসের একটা প্রতিবাদী ঐতিহ্যও আছে। যেটা কপি দর্শনে অসহ্য।

আরও একটা দিক আছে। আধুনিক পুঁজি যখন ২৪/৭ -এর ছকে মানুষকে কলের পুতুল বানাতে চায়, তখনো কিছু মানুষ ব্যক্তিগত পরিসর, বন্ধুত্বের পরিসর খুঁজে নিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা গালগল্পে, হাসিমস্করায়, বন্ধনহীন চর্চায় কফিখানায় সময় কাটাচ্ছে। ঠাসাকাজ আর ছন্নছাড়া বেকারি, এর বাইরে অন্য কিছু মানে তৃতীয় পরিসর গড়ে তোলা। অবসর, ছুটি, অকারণে বন্ধু মিলনের সুখ তারা বুঝতে পারেনা। দুর্বোধ্য মানুষগুলোর ওপর তাই ফ্যাসিস্টরা ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে।

মরতে মরতেও বইপাড়ার একটা বৌদ্ধিক ঐতিহ্য এখনো আছে। বইপাড়ার বিপরীতে বইপোড়া দেখতে ফ্যাসিস্টদের সুখ।

হিটলারের নির্দেশে জার্মানিতে মুক্তচিন্তার সমস্ত বই উৎসব করে পোড়ানো হয়েছিল।এখানের কপিসেনারা বইপাড়াকে ‘মোদিপাড়া’ করার শপথ উর্দিতে লাগিয়ে ভবিষ্যতের কর্মসূচির এক ঝলক দেখিয়ে গেল।

যে তৎপরতায় পরদিন প্রতিবাদী সভা ,গান, ও স্লোগান হয়েছে তাতে আক্রমণের ফাঁকা আওয়াজ ফুৎকারে মিলিয়ে গেছে। তবে আত্মসন্তুষ্টির কোনো কারণ নেই। সময়ের ডাক প্রতি মুহূর্তের সতর্কতা।

Eternal vigilance is the price of freedom.

সজল রায়চৌধুরী

About author

Articles

প্রবীণ লেখক এবং লিটল ম্যাগাজিন কর্মী
সজল রায়চৌধুরী

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *