গরমকালে বাড়ির ছাদে সারি সারি বয়ামে আচার শুকানো আর তার সামনে পিসি বা দিদির রোদে এলোচুলে বসে কাকের হাত থেকে আচার বাঁচানোর স্মৃতি এখনো আমাদের চোখে ভেসে ওঠে। আম থেকে শুরু করে লেবু, তেঁতুল এমনকী বাঁশের আচারও ছিল চোখে পড়ার মতো। এখনকার দিনে ছাদে আচার শুকানো ততটা দেখা না গেলেও পাতে আচার কিন্তু আজও প্রচলিত। জলখাবারে পরোটার সাথে আমের বা পাঁচমেশালি আচার বা শীতের অলস দুপুরে টকমিষ্টি কুলের আচার বাঙালির আচারের প্রতি ভালোবাসা সর্বজনবিদিত। আচারের গুণও খুব একটা কম নয়। এক চামচ আমের আচারে ভিটামিন বি ১২, ভিটামিন সি এবং বেশ কিছু ব্যাকটেরিয়া পাওয়া যায় যা অন্ত্রের জন্য বিশেষভাবে জরুরি। কিন্তু এই আচার তৈরির কারণটিই বা কী?

প্রায় ২০৩০ খ্রিস্টপূর্বাব্দে টাইগ্রিস নদী উপত্যকায় প্রথম আচারের নিদর্শন পাওয়া যায়। এরপরে কর্ণাটকের লিঙ্গপুরমে ‘গুরুলিঙ্গ দেশিকা’ নামক গ্রন্থে প্রায় ৫০ রকমের আচারের প্রণালী পাওয়া গেছে।

সুস্বাদু আচার

আচার বানানো হয় মূলত জারণ প্রক্রিয়া দ্বারা। কোনো মরশুমি খাবারকে সারাবছর ধরে উপভোগ করার জন্যই আচার বানানো হয়।

ভারতে তথা দক্ষিণপূর্ব এশিয়ায় মোট তিনরকম পদ্ধতির মাধ্যমে আচার বানানো হয় – নুনের সাহায্যে, সিরকা বা ভিনিগারের সাহায্যে অথবা তেলের সাহায্যে।

শিকারপুরি আচার

ভারতের বিভিন্ন রাজ্য তথা অঞ্চলে বিভিন্ন আচারের রকমভেদ লক্ষ্য করা যায়। উত্তর ভারতে আচারে ঝালের তীব্রতা একটু বেশি, পূর্ব ভারতে আচার একটু টকমিষ্টি, আর দক্ষিণ ভারতে আচারে সরষের পরিমাণ বেশি হয়। বিভিন্ন অঞ্চলে জলবায়ুর বিভিন্নতাই এর প্রধান কারণ।

আরও পড়ুন : দেশ-বিদেশের আইসক্রিম – সে এক রূপকথার জগৎ

ভারত ছাড়া দক্ষিণপূর্ব এশিয়ার অন্যান্য দেশগুলিতেও প্রায় একই রকম আচার পাওয়া যায়। যেমন পাকিস্তানে শিকারপুরি আচার ও হায়দ্রাবাদি আচার খুবই জনপ্রিয়। এই শিকারপুরি আচার মধ্যযুগেও পাওয়া যেত। গাজর, ফুলকপি, পেঁয়াজ, রসুন, কাবলি ছোলা, লঙ্কা, লেবু ও কাঁচা আম দিয়ে তৈরি হয় এই আচার। নেপালে চেরি লঙ্কা দিয়ে তৈরি লাপ্সিও একধরনের আচার। মায়ানমারে থানাট নাভে যে আচার পাওয়া যায় তা প্রধানত কাঁচা আমের মধ্যে সিরকা, নুন, চিনি, লঙ্কা, সরষে গুঁড়ো ও অন্যান্য মশলার সমন্বয়ে তৈরি। শ্রীলঙ্কা ও দক্ষিণ ভারতের আচারের মধ্যে খুব একটা পার্থক্য নেই বললেই চলে। আফ্রিকায় যে আচার পাওয়া যায় তা মূলত ব্রেডের সাথে খাওয়া হয়।

পিকল

কিন্তু ব্রিটেন ও আমেরিকায় যে পিকল্ খাওয়া তা এই আচারের থেকে সম্পূর্ণ আলাদা। ব্রিটেনে পিকল্ বলতে বোঝায় চিনি ও ভিনিগারের মিশ্রণে জারিত সবজি ও ফল। কিন্তু আমেরিকায় পিকল্ তৈরি হয় মূলত শশা দিয়ে। এক্ষেত্রে শশাকে ভিনিগার ও বেশ কিছু হার্বের মিশ্রণের মধ্যে রেখে কিছুদিনের জন্য ফার্মেন্ট করার জন্য। এরপর শশাকে ছোট করে কেটে এই পিকল্ প্রধানত স্যান্ডুইচের মধ্যে পরিবেশন করা হয়। আমেরিকা ও কানাডায় একে পিকল্ বলা হলেও এটি জার্কিন নামে ব্রিটেন, আয়ারল্যান্ড, অষ্ট্রেলিয়া, সাউথ আফ্রিকা ও নিউজিল্যান্ডে বহুল প্রচলিত।

কিমচি

কিমচি কোরিয়ান ও জাপানের প্রচলিত খাবার যা প্রায় আচারের সমগোত্রীয়। নাপা ক্যাবেজ, স্প্রিং অনিয়নকে নুন, গোচুগারু(লঙ্কা), আদা, রসুন, চালের গুড়ো দিয়ে মেখে এক সপ্তাহ ধরে ফার্মেন্ট করা হয়।

তবে এখনকার দিনে বাড়িতে আচার বানানোর পাট উঠে গেছে বললেই চলে। মুদি দোকানে বা মেলায় গিয়ে রেডিমেড আচার কেনার হিড়িক এখন বেশি। কিন্তু এই বাইরের আচারে প্রিজারভেটিভ থাকে যা শরীরের জন্য উপযোগী নয়। বরং বাড়ির বানানো আচার প্রতিদিন রুটি পরোটার সাথে খাওয়া তুলনামূলক স্বাস্হ্যকর।

অন্বেষা সেনগুপ্ত