প্রশান্ত ভূষণ কি জন আন্দোলনের মুখ হতে পারবেন?

 কল্যাণ সেনগুপ্ত 




এই মুহূর্তে দেশের রাজনীতি সচেতন মানুষের মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত নামটি হচ্ছে প্রশান্ত ভূষণ।  মোদি শাসনের ঘোর অমানিশার অন্ধকারে তাঁর বলিষ্ঠ ভূমিকা বর্তমানে মানুষের চূড়ান্ত হতাশার মধ্যে যেন এক আশার আলো। অনেকের মধ্যেই এরকম ধারণা উঁকি দিচ্ছে যে, মোদি বিরোধী জন আন্দোলনে প্রশান্ত ভূষণ কি কোন বড়ো ভূমিকা গ্রহণে সক্ষম হবেন? না কি তিনি নিজেকে স্রেফ আদালতের লড়াইয়েই সীমাবদ্ধ রাখবেন? আদালতের লড়াই অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ তবু মনে রাখতে হবে, বাস্তবে আইনজীবী যতই ক্ষুরধার যুক্তি দেখাক, শেষপর্যন্ত আদালতের লড়াই কিন্তু নির্ভরশীল বিচারকের রায়ের উপরেই। আর বর্তমান পরিস্থিতিতে সর্বোচ্চ আদালতের বিচারপতিরা সরকারের বিরুদ্ধে রায়দান সমীচীন মনে করছেন না। বিষয়টি অত্যন্ত হতাশাজনক হলেও এমনটাই বেশিরভাগ ক্ষেত্রে পরিলক্ষিত হচ্ছে। রাষ্ট্র তথা পুলিশ-প্রশাসনের অন্যায় আচরণ বা দুষ্কর্মের বিরুদ্ধে একমাত্র আশা বা সুবিচারের আশ্রয়স্থল ছিল আদালত। কিন্তু সেই আদালত তথা বিচারব্যবস্থা, যাকে সংবিধানের রক্ষক বা সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভরূপে গণ্য করা হত, তাও যেন এখন স্রেফ নিয়মরক্ষার এক সরকারি বিভাগে পরিণত হয়েছে।


সরকারকে ক্ষমতাচ্যূত করতে গেলে, বদল করতে গেলে প্রয়োজন নির্বাচনের মাধ্যমে পরাজিত করা। সে সুযোগ আসে পাঁচ বছরে একবার। কেন্দ্রের সরকারকে বদল করতে হলে দেশবাসীকে অপেক্ষা করতে হবে ২০২৪ পর্যন্ত, এখনো প্রায় চার বছর। কিন্তু সরকারের অন্যায় কাজকর্মকে প্রতিরোধ করতে চাই দেশব্যাপী জন আন্দোলন। কারণ, জন আন্দোলনই বদলাতে পারে জনমত। আর নির্বাচনে রাজনৈতিক দলগুলির ভুমিকা মুখ্য হলেও তা অনেকটাই দলীয় স্বার্থদুষ্ট। কিন্তু জন আন্দোলন যদি সেভাবে জনমতের চাপ সৃষ্টি করতে পারে তাহলে অনেক সমস্যারই সমাধান সম্ভব। বর্তমান নির্বাচন প্রক্রিয়াটি অত্যন্ত ত্রুটিপূর্ণ এবং এর সামগ্রিক সংস্কার প্রয়োজন। আমরা দেখেছি, যেভাবে ২০১৯ এর নির্বাচন সম্পন্ন হয়েছে, তা চূড়ান্তই পক্ষপাতদুষ্ট। শাসকদলের সমস্ত রকম নিয়ম উল্লঙ্ঘন ও অন্যায় আচরণের বিরুদ্ধে নির্বাচন কমিশন ছিল সম্পূর্ণ অন্ধ-বোবা-কালা। মনে রাখতে হবে, সংসদীয় গণতন্ত্রে সুষ্ঠু নির্বাচনের ভূমিকা অতীব গুরুত্বপূর্ণ। সেখানে সঠিক জনমতের প্রতিফলন না হলে গোটা ব্যবস্থাটাতেই পচন ধরে এবং ক্রমশ তা এক স্বৈরতান্ত্রিক ব্যবস্থার প্রতিভূ হয়ে উঠে, গণতন্ত্রের গঙ্গাযাত্রা ঘটে। এছাড়াও আমাদের দীর্ঘ অমীমাংসিত বুনিয়াদি সমস্যা সমূহেরও সমাধান জরুরি। বাজার অর্থনীতির প্রভাবকে ঠেকিয়ে জনমুখী অর্থনীতিকে কার্যকরী করার ক্ষেত্রে জন আন্দোলনকে একটি বড়ো ভূমিকা নিতে হয় সরকারকে চাপে রাখতে, যাতে সরকার কর্পোরেট সমাজের কাছে আত্মসমর্পণ না করে। মানুষকে সজাগ ও সমাজ সচেতন রাখতে জন আন্দোলনের ভূমিকা জরুরী এবং তা হলেই বিচার ব্যাবস্থা নিরপেক্ষ দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে যুক্তি ও সততার সঙ্গে রায়দান করতে সক্ষম হবে।


আরও দেখুন 

রবীন্দ্রনাথকে ‘বহিরাগত’ বলে দাগিয়ে অচলায়তন হয়ে উঠেছে শান্তিনিকেতন


আমাদের সংবিধানকে কার্যকরী রেখে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, রোজগার ইত্যাদির মতো বুনিয়াদি সমস্যা সমূহের সমাধানই যাতে সরকারের মূল লক্ষ্য হয় তার জন্য বিভিন্ন সামাজিক সংগঠনের লাগাতার জন আন্দোলন চালিয়ে যেতে হবে। তবে এখানে সমস্যা হচ্ছে এক অবিসংবাদী নেতার অভাব। সেই অভাব পূরণে প্রশান্ত ভূষণ কি এগিয়ে আসবেন, সবাইকে ঐক্যবদ্ধ করে জন আন্দোলনের মুখ হয়ে উঠতে পারবেন? তা সত্যি হলে দেশ মুক্তির প্রকৃত পথ খুঁজে পাবে। কিন্তু আশঙ্কা হচ্ছে, তিনি সেই ধাতের মানুষ নন। তিনি কিছুটা অন্তর্মুখী, কথা কম বলেন, কোনো কিছুতেই খুব বেশি উচ্ছ্বসিত হন না। নিতান্তই বাধ্য না হলে মঞ্চে উঠতে চান না। নেতৃত্বের ডাকাবুকো বিষয়টি তাঁর মধ্যে সেভাবে না থাকলেও তিনি কিন্তু সিদ্ধান্তে স্থির ও দৃঢ় প্রত্যয় নিয়ে চলতেই অভ্যস্ত। স্বভাবে অত্যন্ত মার্জিত হলেও চাপলুসি বা তৈলমর্দনে মোটেই প্রশ্রয় দেন না, যা অধিকাংশ নেতানেত্রীরা উপভোগ করে থাকেন। ফলে সন্দেহ হয়, জন আন্দোলনের নেতৃত্বদানের ক্ষেত্রে তাঁর যে চরিত্র পরিলক্ষিত হয়েছে, তা মোটেই আমাদের আকাঙ্ক্ষার অনুকূল নয়। তবে এই অনুমান যদি ভুল প্রতিপন্ন হয়, তবে তার চেয়ে শুভ আর কিছু হতে পারে না সমাজের পক্ষে, দেশের পক্ষে।


কোন মন্তব্য নেই

Blogger দ্বারা পরিচালিত.