উপনিবেশ বিরোধী কবিতার প্রস্তাবনা



  


ঔপনিবেশিকতার প্রতি মোহ ছড়িয়ে আছে বাংলা কবিতার শিরা-ধমনীতে। এখনও সংখ্যাগরিষ্ঠ কবি ইউরোপ-আমেরিকার তৈরি করে দেওয়া ধাঁচার থেকে বেরোতে হীনমন্যতায় ভোগেন। স্বীকৃতি পাওয়ার জন্য নির্ভর করে থাকেন সাম্রাজ্যবাদী শাসকদের বানানো প্রতিষ্ঠানের ওপর। পাশ্চাত্যকেই সর্বেসর্বা ভাবেন। চেতনায় সযত্নে পুষে রাখেন পুঁজিবাদী পুরুষতন্ত্র। কেন্দ্র এবং প্রান্তের আধুনিক বিভাজনকে জিইয়ে রাখতে বদ্ধপরিকর তাঁরা। ব্যতিক্রম যে নেই তা নয়। স্রোতের বাইরে থাকা ওই সৃষ্টিশীলতা নিয়েই আমাদের চর্চা – ‘উপনিবেশ বিরোধী কবিতা’।

শুধুমাত্র ভূখণ্ড এবং বাজার দখলের মধ্যেই উপনিবেশবাদ সীমাবদ্ধ নয়, বরং, এক ধরনের সাংস্কৃতিক আগ্রাসন এটি। তার বিরুদ্ধে সংগ্রামের হাতিয়ার আমাদের কবিতা। পুঁজিবাদ যতদিন থাকবে, উপনিবেশবাদও থাকবে। আমাদের কবিতা সর্বতোভাবে পুঁজিবাদ বিরোধী। তা বলে মার্কসবাদের ছকেও আমরা কবিতাকে বাঁধতে চাই না। মার্কসীয় দর্শনের মধ্যে যে ইউরোপকেন্দ্রিকতা আছে, তার ব্যাপারে আমরা সচেতন। পশ্চিমি প্রভুদের তৈরি করে দেওয়া চশমা দিয়ে জগৎ আর জীবনকে দেখব না আর। ইউরোপকেন্দ্রিকতা ভেঙে, আধুনিক প্রতিষ্ঠানগুলিকে সওয়াল করে, অপরত্বকে নস্যাৎ করে আমাদের সাধনা।



উপনিবেশ বিরোধী কবিতায় আধুনিকতার দাসত্ব নেই। রয়েছে সাম্রাজ্যবাদী চিন্তাকাঠামো গুঁড়িয়ে দেওয়ার বোধ। হতে পারে সেই কবিতার ভাষা তথাকথিত মান্য বাংলা নয়, হতে পারে স্থানীয় কৃষ্টির থেকে উঠে এসেছে তার বীজ, আরও অনেকরকম পরীক্ষানিরীক্ষা থাকতে পারে কবিতায়। মানবকেন্দ্রিক বাস্তবতায় আর বিশ্বাস রাখতে পারছি না। বিশ্বায়ন, প্রগতি এবং উন্নয়নের বেলুন আমরা ফুটো করে দিতে চাই। ফাঁস করতে চাই কলাকৈবল্যবাদের পর্দা। কবিতায় রোমান্টিসিজম ত্যাগ করতে হবে। সব রকম মৌলবাদ, পুরুষতন্ত্র, জাতিরাষ্ট্রের আনুগত্যকে ঝেড়ে ফেলতে হবে। তুলে ধরতে হবে অবদমিতের স্বর। কবিতা যেন স্লোগান কিংবা বিবৃতি না হয়ে দাঁড়ায়, সেই ব্যাপারে কবি সতর্ক থাকবেন। কবিতাচৈতন্য এবং ইতিহাসচৈতন্যের সংযোগ না ঘটলে উপনিবেশ বিরোধী কবিতা লেখা সম্ভব নয়।

সমাজ এবং ইতিহাসের বহুমাত্রিকতা তুলে আনতে হবে কবিতায়। আমরা সব রকম কর্তৃত্ববাদের বিরুদ্ধে এবং বহুস্বরের পক্ষে। আমাদের নৈতিক অবস্থান নেই, রাজনৈতিক অবস্থান রয়েছে। সত্য নির্মাণের পেছনে যে ক্ষমতাতন্ত্র কাজ করে, তার মুখোশ খুলে দিই। ‘উপনিবেশ বিরোধী কবিতা’-র অনুশীলন কোনো আন্দোলন নয়, দার্শনিক মতবাদ তো নয়ই। সমকালীন তৃতীয় বিশ্বের কবিতাচর্চার কয়েকটি প্রবণার সমষ্টি মাত্র।

প্যাঁচাল পড়া অনেক হল। এবার চলুন কবিতা লেখা যাক।

ছবি - সুপ্রিয় মিত্র 


  

1 টি মন্তব্য:

Blogger দ্বারা পরিচালিত.