থানা-পুলিশের গন্ধ মুছে শিল্প-সৃজনে মজেছে লালবাজার





যে কোনো সৃষ্টিশীল কাজের একটা বড় পুঁজি হলো দুর্মর আবেগ। সেই রকমই এক নাছোড় আবেগে ভর দিয়ে শুরু হয়েছিল কাজ। শাল, মহুয়ার শহর ঝাড়গ্রাম লাগোয়া ছোট্ট গ্রাম ‘লালবাজার’, মূলত লোধা, শবর সম্প্রদায়ের গুটিকয় মানুষের বাস। তাই লালবাজার, সহজ সরল অনাড়ম্বর, এক চুপচাপ গ্রাম। এই রকম এক গ্রামে এক শীতের বিকেলে যদি কিছু তরুণ শিল্পী, যারা প্রাণ ও প্রকৃতির সৌন্দর্য খুঁজে বেড়ান সর্বত্র, তারা যে এক লহমায় এই সবুজ ঘেরা গ্রামের কাছে মন হারাবেন – এ তো খুব স্বাভাবিক। সেই তখন থেকে শুরু স্বপ্নের আর সৃষ্টির...।



   একটা আস্ত গ্রামকে ক্যানভাস করে রং তুলির আঁচড়ে রঙিন করে তোলার প্রয়াসে নেমেছেন এক ঝাঁক শিল্প মনের অধিকারী দল। ইতিমধ্যে ‘লালবাজার’ নামে থাকা ‘থানা-পুলিশ’ গন্ধ কে মুছে দিয়ে, তার শিল্পসম্মত নামকরণ করেছেন খ্যাতনামা অধ্যাপক ও প্রাবন্ধিক শিবাজী বন্দ্যোপাধ্যায়। এখন গ্রামের নাম ‘খোয়াবগাঁ’, একে বলতেই হয় সার্থকনামা, সৃজনশীল কর্মচঞ্চল যেসব তরুণের চোখে নতুন কিছু করে দেখানোর খোয়াব কাজলের মত আঁকা, তাদের স্বপ্নপুরীর সঠিক নাম – ‘খোয়াবগাঁ’।



   অরণ্য সুন্দরী ঝাড়গ্রামের সবচেয়ে বড় শিল্প ও সৌন্দর্য হলো এখানের সুউচ্চ শাল গাছ। মূল শহর ও শহরতলির সব রাস্তায় অনুপম শাল-বীথির এক প্রাকৃতিক শ্যামলিমা এখানের এক সম্পদ, সেই সৌন্দর্যশালী সম্পদ ছড়ানো রয়েছে খোয়াবগাঁ যাতায়াতের পথে। আর খোয়াবগাঁতে বোনা হয়ে চলেছে এক অখণ্ড শিল্পমালা। এখানে মাটির বাড়ির দেওয়াল নানা রঙে রঙিন হয়ে, হয়েছে মুখর। রয়েছে আলপনা, নকশা। খোয়াবগাঁ কে কেন্দ্র করে যে স্বপ্ন-সন্ধানী শিল্পীরা রয়েছেন, তাদের অনেকেই প্রথাগত শিল্পের ছাত্র-ছাত্রী নন, তারা মনের খেয়ালে শিল্পী। বলা ভালো তাদের জন্যই খোয়াবগাঁ, তাদের জন্যই খোলা আকাশের নিচে একটা সবুজ ঘেরা গাঁ দাঁড়িয়ে রয়েছ ক্যানভাস হয়ে। খোয়াবগাঁয়ের মাটির দেওয়ালে দেওয়ালে যেন এক হাতছানি – এসো হাতে নাও তুলি, পাত্রে নাও রঙ,  তোমার চেতনার রঙে ও রেখায় ভরিয়ে তোলো আমাকে। সুন্দরে সুন্দরে ভরিয়ে তোলার এই কর্মযজ্ঞে যারা শামিল, তাদের অধিকাংশই কলকাতার ‘চালচিত্র আকাদেমি’র সঙ্গে যুক্ত শিল্পী, যার অন্যতম হলেন মৃণাল মন্ডল, যিনি আবার জন্মসূত্রে ঝাড়গ্রামের বাসিন্দা। মূলত মৃণালের পরিকল্পনা ও আন্তরিক আহ্বানে আরও অনেকের শিল্পসম্ভারে সেজে উঠছে খোয়াবগাঁ।




   আর সেই সৃষ্টিশীল স্বপ্নের পথে ইতিমধ্যে শরিক হয়েছেন যারা, তারা হলেন বিশিষ্ট আলপনা শিল্পী বিধান বিশ্বাস,  রয়েছেন ‘ঝাড়গ্রাম প্যালেট রূপকলা চর্চা কেন্দ্র’-এর কর্ণধার সৌরভ ধবলদেব, নানা মাধ্যমে শিল্পকে ফুটিয়ে তোলার এক ‘ঈশ্বর-প্রদত্ত’ প্রতিভার অধিকারী রামেশ্বর সরেন, আছেন কাটুম -কুটুম শিল্পী যজ্ঞেশ্বর হাঁসদা। এছাড়া নানা সময়ে এসে স্বাক্ষর রেখে গেছেন আরও অনেকে। যেমন, যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র কৌস্তুভ চক্রবর্তী, কাঁথা শিল্পী জয়তী ব্যানার্জি...



   আর শুধু যে শিল্পীর খামখেয়ালিপনায় নিকোনো মাটির দেওয়াল রঙিন হয়ে হেসে উঠছে তা নয়, সে হাসি ছুঁয়ে যাচ্ছে খোয়াবগাঁর খেটে খাওয়া, সাদাসিধে মানুষ-মানুষী এবং অতি অবশ্যই অনাবিল শৈশব ও কৈশোরে থাকা ছেলেমেয়েদের। শিল্পীর অনুকরণে রঙ তুলি নিয়ে দেওয়াল রঙ করছে তারাও। এখন এই শিল্প ও সুন্দরের সংক্রমণে আসা ছেলে মেয়েদের কথা ভেবে মৃণাল, সৌরভ, রামেশ্বররা শুরু করেছেন সাপ্তাহিক শিক্ষণ, ওদেরকে শুধু শিল্প শিক্ষা নয়, প্রথাগত মূল শিক্ষালাভের পথে নানা ভাবে সাহায্য করতে চান তারা,পরিকল্পনা আছে এখানকার মহিলাদেরকে নানান হস্তশিল্পের প্রশিক্ষণ দেওয়ার।



   সব মিলিয়ে মাত্র কয়েক মাসে খোয়াবগাঁ হয়ে উঠেছে এক শিল্প-গ্রাম । সচেতন স্বাধীন শিল্পীর চেতনার রঙে রাঙানো এক বৃহৎ পট। সেখানে সামিল হতে পারেন আমি, আপনি, সবাই। ইচ্ছে খুশির রঙে ভরিয়ে তুলতে পারেন খোয়াবগাঁয়ের প্রাণ ও প্রকৃতিকে।



কোন মন্তব্য নেই

Blogger দ্বারা পরিচালিত.